মিথ্যা মামলার অভিযোগে আলোচনায় সুরভী, জুলাইযোদ্ধাদের সতর্ক থাকার আহ্বান নাহিদ ইসলামের

ছবি- সংগৃহীত।

আলোচিত জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভী ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ১১দিন কারাগারে থাকার পর চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে বের হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলা এবং চলমান বিচারকার্য নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, চলছে নানা রকমের আলোচনা ও সমালোচনা।

৭ জানুয়ারি মধুর ক্যান্টিনে সুরভীকে নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়াসহ ৩ দফা দাবিতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি প্রেস ব্রিফিং হয়। কারাগার থেকে মুক্তির পর অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে তিনি সবকিছু বর্ণনা করার পরিস্থিতে নেই বলে জানিয়েছেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই প্রেস ব্রিফিং এ। তবে একটু সুস্থ হয়েই তিনি সবকিছু সবিস্তারে জানাবেন বলেন।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম বলেন, “তাহরিমা জান্নাত সুরভী জুলাই এর একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। জুলাই এর পর কোনো রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত হননি তিনি। আবার, পড়ার টেবিলে ফিরেও যাননি। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোতে তিনি সরব ও প্রতিবাদী ভূমিকায় রাজপথেই থাকতেন।”

তিনি আরো বলেন, “যেহেতু তিনি কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন না, তার গ্রেপ্তারের পর তা যাচাই করতে আমাদের কিছু সময় লাগে। পরে আমরা যাচাই করে মিথ্যা মামলার ব্যপারে নিশ্চিত হয়ে এটা নিয়ে কাজ শুরু করি।”

বৈছাআ এর সূত্রে আরো কিছু তথ্য সামনে আসে। নাঈমুর রহমান দুর্জয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে একটি ছবি দেখিয়ে নিজেকে তাঁর ‘সন্তানতুল্য’ ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেন। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি সুরভীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সুরভী বিভিন্ন প্রতিবাদী আয়োজনে অংশগ্রহণ করতেন এবং সরব ভূমিকা  রাখতেন, এই সূত্রে সে সেই সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ রাখেন।

উল্লেখ্য, মামলার বাদী সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় আগে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এ চাকরিরত ছিলেন। এসব ঘটনার কারণে তাকে সেখান থেকে চাকরিচ্যূত করে হয় এবং বর্তমানে তিনি কালবেলা পত্রিকার সাংবাদিক।

এক পর্যায়ে নাঈমুর রহমান দুর্জয় সুরভীকে কুপ্রস্তাব দেন এবং কক্সবাজার যাওয়ার প্রস্তাব দেন। সুরভী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং বিষয়টি ফেসবুকে প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানান। নভেম্বরের ২৪ তারিখ সেই কল রেকর্ড সুরভী তার ফেইসবুক প্রোফাইলে আপলোড দিয়েছিলেন।

কল রেকর্ড ফেইসবুকে পোস্ট করার আগে ১৮ই নভেম্বর দুর্জয় গাজীপুরের চান্দরা চৌরাস্তায় একটি ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা বলে সুরভীকে ডেকে নেন। তিনি সুরভীকে সেখানে না নিয়ে কালিয়াকৈর থানার সফিপুর বাজারের পাশে, মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের ঠিক বিপরীতে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। সুরভী চিৎকার করে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

পরবর্তীতে, ২৬ নভেম্বর সুরভীর মা ছামিতুন আক্তার বাদী হয়ে নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে কালিয়াকৈর থানায় ধর্ষণচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু অভিযুক্ত তাকে গ্রেপ্তার না করে পুলিশ উল্টো সুরভীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতে থাকে।

এদিকে, মামলা হওয়ার পরপরই অভিযুক্ত দুর্জয় আগাম জামিন পেয়ে যায়। আগাম জামিন নিয়ে সে সুরভী ও তার পরিবারকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেয়। হাদী হত্যার প্রতিবাদে একটা প্রোগ্রামে দুর্জয়কে দেখে সুরভী ভূয়ে ভূয়ে স্লোগান দিলে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সুরভীর বিরুদ্ধে  মিডিয়া ট্রায়াল চালায় সে। এছাড়াও ওই সাংবাদিক সংঘবদ্ধভাবে মিডিয়া ট্রায়াল চালিয়ে সুরভীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করান।

এরপর ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল, মারধর ও প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, নাঈমুর রহমান দুর্জয় অভিযোগ করেন যে, সংবাদ প্রকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে তাহরিমা জান্নাত সুরভী তাকে ডেকে নেন এবং পরিকল্পিতভাবে অপহরণ ও আটকে রাখেন। এ সময় তাকে মারধর করা হয় এবং তার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্তরা ভুক্তভোগী সাংবাদিকের বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট থেকে নগদসহ মোট ৪৯ হাজার ২৭০ টাকা আদায় করে নেয় এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করে পরদিন তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এগুলো নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের করা এজাহারভিত্তিক অভিযোগ মাত্র। আদালতে এখনো অপহরণ, চাঁদাবাজি বা ব্ল্যাকমেইলের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, তদন্তও সম্পন্ন হয়নি। এমনকি রিমান্ড শুনানির সময় আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে, এজাহার ছাড়া এক নম্বর আসামি তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বিরুদ্ধে অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিমান্ড বাতিল করে সুরভীকে চার সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন। একই সঙ্গে বয়স সংক্রান্ত অসঙ্গতি ও তদন্তে গাফিলতির কারণে তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বয়স নিয়ে মামলার নথিতে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের করা মামলার এজাহারে সুরভীর বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়। অথচ একই দিনে একই থানায় দায়ের হওয়া সুরভীর মায়ের মামলায় (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ধারা ১০) সুরভীর বয়স ১৭ বছর উল্লেখ করা হয়। দুটি মামলাই কালিয়াকৈর থানায় দায়ের হয় এবং একই তদন্ত কর্মকর্তা (উপ-পরিদর্শক মো. ওমর ফারুক) উভয় মামলার দায়িত্বে ছিলেন। ফলে তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষে বয়সের এই পার্থক্য না জানা বা উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল না।

এরপর আদালতে সুরভীকে হাজির করার সময় পুলিশ যে ফরোয়ার্ডিং প্রতিবেদন দাখিল করে, সেখানে তার বয়স আবার ২০ বছর দেখানো হয়। অর্থাৎ, এজাহারে ২১, ফরোয়ার্ডিংয়ে ২০ এবং মায়ের মামলায় ১৭- এভাবে বয়স নিয়ে তিন ধরনের তথ্য উপস্থাপিত হয়, যা আদালতের দৃষ্টিতে গুরুতর অসঙ্গতি হিসেবে ধরা পড়ে। পরবর্তীতে তার জন্ম নিবন্ধনে তার বয়স ১৭ বছর ১ মাস পাওয়া যায়।

এই বয়সসংক্রান্ত বিভ্রান্তির গুরুত্ব বেড়ে যায়, কারণ বয়স যদি ১৮ বছরের নিচে হয়, তাহলে তিনি কিশোরী হিসেবে ভিন্ন আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী, রিমান্ডসহ অনেক কঠোর ব্যবস্থা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু রিমান্ড আবেদনের সময় এই বিষয়টি আদালতের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।

তাহরিমা জান্নাত সুরভী প্রকাশ্যে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তার আইনজীবীরাও বলেছেন, মামলাটি এখনো বিচারাধীন এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাকে অপরাধী বলা যাবে না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, সুরভী তার মাকে জানিয়েছে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার অন্তর্গত মৌচাক পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত এসআই ওমর ফারুক তার কাছে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তদন্ত ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে ওই পুলিশ সদস্য।

সুরভিকে সোমবার রাতে জামিন দিয়ে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার পর নাহিদ তার বাসায় যাওয়ার সময় বলেন, “তাহরিমা জান্নাত সুরভিকে ন্যায় বিচার পাওয়া যায়নি। পুরো বিষয়টি মনগড়া।” তিনি অভিযোগ করেন যে, আসন্ন নির্বাচনের আগে গণআন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা ব্যক্তিদেরকে বদনাম করার জন্য মিডিয়ার একাংশ চেষ্টা করছে।

এনসিপি নেতা বলেন, সুরভিকে নিয়ে ঘটানো ঘটনা হলো এই ধরনের ব্যক্তিদের কলঙ্কিত করার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

তিনি দাবি করেন যে, স্বার্থান্বেষী কিছু মহল দেশ অস্থিতিশীল করার এবং অরাজকতা সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত। নাহিদ সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

মালিহা নামলাহ