ক্রিকেট মাঠে যখন ব্যাটে-বলের লড়াই হওয়ার কথা, তখন রাজনীতির উত্তাপ আর কূটনৈতিক দরকষাকষিতে টালমাটাল দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট অঙ্গন। আইপিএল ২০২৬ মৌসুমের নিলামে রেকর্ডমূল্যে বিক্রি হওয়া বাংলাদেশি বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সূত্রপাত, তা এখন দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রমে গিয়ে ঠেকেছে। ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই) কর্তৃক মুস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের ডাক—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্ব ক্রিকেট।
ঘটনার শুরু আইপিএল ২০২৬-এর নিলাম থেকে। আইপিএলের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও সফল বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিতে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স ৯ কোটি ২০ লাখ রুপির বিশাল অঙ্কে তাকে দলে ভেড়ায়। ২০১৬ সাল থেকে আইপিএলে নিয়মিত খেলা মুস্তাফিজের জন্য এটি ছিল অন্যতম প্রাপ্তি।
তবে এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার পরপরই ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে দাবি তোলা হয়—কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ভারতের মাটিতে খেলতে দেওয়া হবে না।
আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুর বলিউড তারকা শাহরুখ খানের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “বাংলাদেশে হিন্দুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। এমন নৃশংসতা দেখার পরও একজন দলের মালিক কীভাবে এতটা হৃদয়হীন হতে পারেন? সেই দেশের কোনো ক্রিকেটারকে নিজের দলে নেওয়া নিষ্ঠুরতা।” একই সুর শোনা যায় অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশনের প্রধান উমর আহমেদ ইলিয়াসির কণ্ঠেও। তিনি দাবি করেন, মুস্তাফিজকে দলে নেওয়ার জন্য শাহরুখ খানকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। শিবসেনা নেতা সঞ্জয় নিরুপমও জনরোষের দোহাই দিয়ে কেকেআরকে সতর্ক করেন।
বিসিসিআই-এর হস্তক্ষেপ
রাজনৈতিক চাপের মুখে পেশাদারিত্বের চেয়ে আবেগ ও রাজনীতি প্রাধান্য পায় বিসিসিআই-এর সিদ্ধান্তে। গত শনিবার বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকীয়া সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে নিশ্চিত করেন যে, বোর্ড কেকেআর-কে নির্দেশ দিয়েছে মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দিতে। বিসিসিআই তাদের নির্দেশে ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’র কথা উল্লেখ করলেও কোনো নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেনি। তবে কেকেআর-কে মুস্তাফিজের পরিবর্তে অন্য কোনো বিদেশি খেলোয়াড় (রিপ্লেসমেন্ট) নেওয়ার অনুমতি দেয় বোর্ড।
বিসিসিআই-এর এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় ক্রিকেট মহলেও বিস্ময় সৃষ্টি করে। ভারতের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ক্রিকেটার মদন লাল ‘ইন্ডিয়া টুডে’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “বিসিসিআই-এর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কিন্তু খেলাধুলার মধ্যে কেন এত রাজনীতি ঢুকে পড়ছে তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।”
বাংলাদেশের প্রতিবাদ ‘গোলামির দিন শেষ’
মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার খবর বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর সাধারণ মানুষ ও সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। তিনি বিষয়টিকে ‘অবমাননাকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “আমরা কোনো অবস্থাতেই অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ!”
আসিফ নজরুল দ্রুততার সাথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন: বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়ার নির্দেশ, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার হুঁশিয়ারি, বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ।
তার এই বক্তব্যের পর দেশজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়ে ওঠে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বয়কট আইপিএল’ হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হতে শুরু করে।
বিশ্বকাপের ভেন্যু নিয়ে লড়াই, বিসিবির অনড় অবস্থান
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত ৩ ও ৪ জানুয়ারি দফায় দফায় বৈঠকে বসে বিসিবি। ১৭ জন পরিচালকের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, খেলোয়াড়, টিম ম্যানেজমেন্ট, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি বড় করে দেখা হবে। বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসি-কে ইমেইল করে জানায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায় বিসিবি।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক মতবিনিময় সভায় বলেন, “খেলার যুক্তিতে যদি মানা করা হতো, তবে প্রশ্ন থাকত না। কিন্তু যে যুক্তিতে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা আমরা গ্রহণ করতে পারি না। সরকার এ বিষয়ে একটি শক্ত আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থান নেবে।” ইতিমদ্যেই বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আইসিসির ভূমিকা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য
গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইএসপিএন ক্রিকইনফো’ এক প্রতিবেদনে দাবি করে যে, আইসিসি বাংলাদেশের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ভারতে না খেললে বাংলাদেশকে ‘ওয়াকওভার’ বা পয়েন্ট হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
তবে বুধবার সকালে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এই সংবাদকে ‘গুজব’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, আইসিসি কোনো আল্টিমেটাম দেয়নি; বরং তারা বিসিবির কাছে নিরাপত্তার উদ্বেগের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে। বুলবুল বলেন, “আইসিসি জানতে চেয়েছে কেন আমরা মনে করছি ভারতে আমাদের ক্রিকেটাররা নিরাপদ নন। আমরা খুব দ্রুতই সেই ব্যাখ্যা তাদের কাছে পাঠাব।”
বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবরও একই সুরে কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “একজন তারকা ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিয়ে যদি এত প্রশ্ন থাকে, তবে হাজার হাজার সমর্থক ও মিডিয়াকর্মীদের নিরাপত্তার দায় কে নেবে? কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আইসিসি বা ভারত কি সেই দায়ভার নেবে?”
খেলাধুলার অন্যান্য ক্ষেত্রেও অস্থিরতা
মুস্তাফিজ ইস্যুর প্রভাব ক্রিকেটের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে অনুষ্ঠিতব্য প্রফেশনাল গলফ ট্যুর অব ইন্ডিয়া (পিজিটিআই)-তে বাংলাদেশের নামী গলফার জামাল হোসেন ও সিদ্দিকুর রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক ও পিজিটিআই সভাপতি কপিল দেব জানিয়েছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া ভারতের নির্ধারিত বাংলাদেশ সফরও স্থগিত হওয়ার পথে।
৭ জানুয়ারি বিকেলে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার সাথে বৈঠকের পর বিসিবি তাদের অবস্থানে আরও কঠোর হয়েছে। আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, আইসিসি সম্ভবত পরিস্থিতির গুরুত্ব এখনো অনুধাবন করতে পারেনি। বাংলাদেশ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে—নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এখন দেখার বিষয়, হাতে মাত্র এক মাস সময় রেখে আইসিসি কি বাংলাদেশের দাবি মেনে নিয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর করবে, নাকি বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী বাজার বাংলাদেশের অনুপস্থিতিতেই বিশ্বকাপ আয়োজন করবে? ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছে আইসিসি-র পরবর্তী ইমেইলের দিকে। তবে মুস্তাফিজুর রহমানের এক আইপিএল ক্যারিয়ারের যবনিকাপাত যেভাবে দুই দেশের সম্পর্কের ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে, তা আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসে বিরল ও নজিরবিহীন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
-মীর মোমিন










