বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত হতে যাওয়া উৎপাদন-অংশীদারি চুক্তির (পিএসসি) নতুন খসড়ায় শ্রমিকদের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ‘শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল’ (ডব্লিউপিপিএফ) থেকে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হতে পারে, যা দেশের শ্রম আইন ও মানবাধিকার অবস্থানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন ও শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি লাভজনক কোম্পানিকে তাদের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের কল্যাণে এই তহবিলে জমা দিতে হয়। এই অর্থের ১০ শতাংশ যায় সরকারি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে এবং ১০ শতাংশ কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে। বাকি ৮০ শতাংশ সরাসরি শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
পিএসসি পর্যালোচনা কমিটির খসড়ায় এই সুবিধাটি বাদ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পর্যালোচনা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. ম তামিম জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এটি মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এই কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার এই পদক্ষেপকে ‘শ্রমিক স্বার্থবিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “আইন লঙ্ঘন করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের শ্রমনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এক বা দুটি কোম্পানির জন্য আইন শিথিল করা হলে তা পুরো খাতের শ্রমিকদের অধিকার হরণ করবে।”
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সরকার ইতিমধ্যে করমুক্ত সুবিধা, শুল্ক অব্যাহতি এবং সম্পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধারের (Cost Recovery) মতো বিশাল সুবিধা দিচ্ছে। এর বাইরে শ্রমিকদের লাভের অংশ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবটি কোনোভাবেই বিনিয়োগবান্ধব যুক্তি হিসেবে টেকসই নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো (IOC) বাংলাদেশে না আসার প্রধান কারণ ‘শ্রমিক মুনাফা’ নয়, বরং:
তথ্যের অভাব: সমুদ্র এলাকায় পর্যাপ্ত সিসমিক সার্ভে ডেটার অভাব।
উচ্চ ঝুঁকি: অফশোর অনুসন্ধানে ঝুঁকি বেশি এবং সফলতার হার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা: অন্য দেশের তুলনায় রিটার্ন বা মুনাফার হার নিয়ে দরকষাকষি।
বিনিয়োগকারীরা মূলত যেখানে ঝুঁকি কম এবং মজুত প্রমাণিত থাকে সেখানেই বিনিয়োগ করতে পছন্দ করে। ফলে ডব্লিউপিপিএফ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়, বরং এটি কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেই থাকা উচিত।
২০১২ সালে সমুদ্র জয়ের পর এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অনুসন্ধান শুরু করা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডব্লিউপিপিএফ-এর মতো লাভ-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাকে দায় হিসেবে না দেখে জাতীয় রাজস্ব এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখা উচিত।
শ্রমিক কল্যাণের এই তহবিলটি আইএলও (ILO) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় অপরিহার্য। বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে দেশের প্রচলিত আইনকে পাশ কাটিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের আইনি ও সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ১৫ জানুয়ারি কমিটির প্রতিবেদনে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কী সুপারিশ আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে শ্রমিক সংগঠন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
-এম. এইচ. মামুন









