ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদত ও পরিকল্পনায় এই ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে ডিবি।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭) ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন (২৬), তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), কবির (৩৩), নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭) ও ফয়সাল (২৫)।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা হাদিকে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে অত্যন্ত কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয়। ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, মোটরসাইকেলটির চালক ছিলেন আলমগীর হোসেন এবং পেছনে বসে সরাসরি গুলি করেন ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ। গুরুতর আহত হাদিকে পরে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
তদন্তে উঠে এসেছে, হাদিকে হত্যার পরিকল্পনাটি ছিল গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ডিবি প্রধানের ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের ক্যাডাররা হাদির রাজনৈতিক কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের ‘সার্বিক সহায়তাকারী’ হিসেবে নাম এসেছে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর। তিনি ঘাতক ফয়সাল ও আলমগীরকে পালিয়ে যেতে সরাসরি আর্থিক ও প্রশাসনিক মদত দিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ঘাতক ফয়সালকে পালিয়ে যেতে তার পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা। ফয়সালের বাবা, মা, বোন, দুলাভাই, স্ত্রী ও বান্ধবীসহ আটজন তাকে আত্মগোপনে থাকতে এবং আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে সহায়তা করেছেন। এছাড়া তাকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টায় জড়িত ছিলেন ফিলিপ, সিবিয়ন ও সঞ্জয়সহ আরও কয়েকজন। নুরুজ্জামান নামে একজন আসামি ফয়সালের পলায়নের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
ডিবি প্রধান জানান, মামলাটি প্রমাণের জন্য তারা সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করেছেন। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, আসামিদের উদ্ধারকৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক রিপোর্ট, উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও বুলেটের ব্যালেস্টিক পরীক্ষা, গ্রেপ্তারকৃত ১১ জন আসামির জবানবন্দি ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য।
এখন পর্যন্ত ১১ জন গ্রেপ্তার হলেও সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুজনসহ মোট ছয়জন এখনো পলাতক রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ১৭ নম্বর আসামি ফয়সালকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মূল অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্যাডাররা যখন সুপরিকল্পিতভাবে একজন ছাত্রনেতাকে টার্গেট করে, তখন তার পেছনে পুরো একটি রাজনৈতিক বলয়ের সমর্থন থাকে—চার্জশিটে সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত হয় কি না।
-এম. এইচ. মামুন










