প্লাস্টিকদূষণ ও জেলিফিশের আধিক্যে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংকটে

ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে কক্সবাজারের প্রবালসমৃদ্ধ সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূল সবখানেই দেখা দিচ্ছে উদ্বেগজনক চিত্র। সমুদ্রের ২ হাজার মিটার গভীরতায় প্লাস্টিকের উপস্থিতি, বড় মাছের ক্রমাগত হ্রাস এবং উপকূলজুড়ে জেলিফিশ ও জেলিফিশসদৃশ প্রাণীর অস্বাভাবিক বিস্তার বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য এখন গুরুতর চাপের মুখে। এই পরিস্থিতি শুধু পরিবেশগত ঝুঁকিই নয়, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক, কমছে বড় মাছ

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ‘আরভি ড. ফ্রিডজফ নেনসন’ গবেষণা জাহাজে পরিচালিত এই জরিপে গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন, যাদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বৈঠকে জানান, জরিপে প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা গভীর সমুদ্র পর্যন্ত দূষণের বিস্তারকে স্পষ্ট করে।

তিনি বলেন, ২০১৮ সালের এক গবেষণার তুলনায় গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু গভীর অঞ্চল নয়, স্বল্প গভীর সমুদ্রেও মাছ কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অভিযানে ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে, যা বঙ্গোপসাগরের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন তথ্য যোগ করেছে।

জেলিফিশের আধিক্য ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট লক্ষণ

গভীর সমুদ্রে বড় মাছ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে জেলিফিশের আধিক্য। অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের মতে, গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের অতিরিক্ত উপস্থিতি বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, যার পেছনে অতিরিক্ত মাছ আহরণ বড় ভূমিকা রাখছে। এই গভীর সমুদ্রের চিত্রের প্রতিফলন যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উপকূলে।

সেন্ট মার্টিনে মাছ উধাও, জালে জেলিফিশ

প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপের আশপাশের সাগরে সম্প্রতি ভয়াবহ মাছ সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জেলেদের জালে এখন মাছের বদলে উঠছে ঝাঁকে ঝাঁকে জেলিফিশ ও জেলিফিশের মতো দেখতে ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী, যাদের বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় ‘জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটন’। জেলেরা স্থানীয়ভাবে এগুলোকে ‘নুইন্যা’ নামে চেনেন।

সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ট্রলারমালিক আবু তালেব জানান, গত ১ ডিসেম্বর থেকে দ্বীপে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও গত সাত থেকে আট দিন ধরে প্রায় কোনো মাছই ধরা পড়ছে না। বিস্তীর্ণ সাগরজুড়ে কেবল জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের ঝাঁক দেখা যাচ্ছে, যা আগে কখনো এমনভাবে দেখা যায়নি।জেলেদের ধারণা, এই প্রাণীর আধিক্যের কারণেই মাছ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

গবেষকদের জরিপ: ২৫০ বর্গকিলোমিটারে অস্বাভাবিক আধিক্য

এই পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের একদল গবেষক সম্প্রতি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম জলসীমায় জরিপ চালান। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ১১ দিন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

ড. শাহ নেওয়াজ চৌধুরী জানান, প্রতিটি ঝাঁক কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং পানির ওপর থেকেই এগুলোর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তাঁর মতে, এত বড় পরিসরে জেলিফিশ জাতীয় প্রাণীর বিস্তার সামুদ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত।

তিনি আরও জানান, ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো সেন্ট মার্টিন এলাকায় এই প্রাণীর অস্তিত্ব নথিভুক্ত হয়, যা পরে একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল।

কেন বাড়ছে জেলিফিশ

কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে জেলিফিশ ও জেলাটিনাস জুপ্লাঙ্কটনের সংখ্যা বাড়তে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামুদ্রিক কাছিম জেলিফিশের প্রধান শিকারি, আর জেলিফিশ খায় মাছের ডিম ও পোনা। ফলে কাছিম কমে গেলে জেলিফিশ বাড়ে, আর জেলিফিশ বাড়লে মাছের নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সেন্ট মার্টিনে হঠাৎ এই প্রাণীর আধিক্য ও মাছের উধাও হওয়ার বিষয়টি জানতে বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

ট্রলার, সোনার ফিশিং ও গভীর সমুদ্রের চাপ

গভীর সমুদ্রের গবেষণায় আরও জানা গেছে, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ট্রলার গভীর এলাকায় মাছ আহরণ করছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘টার্গেটেড ফিশিং’ করছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত।

এই পদ্ধতির ফলে দ্রুত কমছে বড় মাছের মজুত। গভীর সমুদ্রের বড় জেলেরা লাভবান হলেও স্বল্প গভীর পানির জেলেরা পড়ছেন চাপে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বৈঠকে সতর্ক করে বলেন, এভাবে টার্গেটেড ফিশিং চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগর একসময় মাছশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি জানান, সোনার ফিশিং বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।

আশার দিক: টুনা ও ফিশিং নার্সারি

গবেষণায় কিছু ইতিবাচক তথ্যও উঠে এসেছে। গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের ভালো উপস্থিতি এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ফিশিং নার্সারি’ শনাক্ত হয়েছে, যেটি সংরক্ষণের নির্দেশনা সরকার ইতোমধ্যে দিয়েছে।

অবহেলার মূল্য দিচ্ছে সমুদ্র : প্রধান উপদেষ্টা

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় সমান জলভাগ থাকা সত্ত্বেও এই সামুদ্রিক সম্পদ দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল।

তিনি বলেন, “আমরা জানতামই না আমাদের সমুদ্রে কী পরিমাণ সম্পদ আছে, কিংবা বিপর্যয় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। পর্যাপ্ত গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই সম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়।”

তিনি জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির জরিপ জাহাজ ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বাড়াবে।

সতর্ক সংকেত

বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিকের উপস্থিতি, বড় মাছের দ্রুত হ্রাস এবং সেন্ট মার্টিনের উপকূলে জেলিফিশের আধিক্য এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য বড় সতর্ক সংকেত বহন করছে। এর প্রভাব পড়ছে ইতোমধ্যেই জেলেদের জীবিকায়, আর ভবিষ্যতে পড়তে পারে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

-সাবরিনা রিমি,নিউজ ডেস্ক