বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর মতো দুটি বিপরীতমুখী মেরুর রাজনৈতিক শক্তির এক টেবিলে আসা এবং জোটবদ্ধ হওয়া বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও বিস্ময়কর ঘটনা। এই জোট গঠনের নেপথ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত কারণ কাজ করেছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ ও ‘মূলধারা’র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে মরিয়া ছিল। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের চাপে কোণঠাসা থাকা জামায়াত এমন একটি শক্তির সঙ্গ খুঁজছিল, যাদের গায়ে ‘পুরনো রাজনীতির’ তকমা নেই। এনসিপি যেহেতু একটি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের আপাততঃ একমাত্র দাবিদার, তাই তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়াকে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক বৈধতা বা ‘পলিটিক্যাল রিব্র্যান্ডিং’-এর বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সারা বাংলাদেশে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো বা লোকবল তাদের নেই। অন্যদিকে জামায়াতের রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী এবং সুসংগঠিত ভোট ব্যাংক। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এবং মাঠ পর্যায়ে নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে এজেন্ট ও পাহারা নিশ্চিত করতে এনসিপি মূলত জামায়াতের সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে চেয়েছে। সংক্ষেপে বললে এনসিপি এই ‘ভোট ও সংগঠন’ বনাম ‘নতুন ইমেজের’ বিনিময়ই তাদের এক করেছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে প্রধান দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিএনপি এককভাবে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করায়, জামায়াত ও অন্যান্য ছোট দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে একটি ‘বিকল্প ব্লক’ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপি ও জামায়াত একে অপরের পরিপূরক হতে চেয়েছে যাতে তারা একটি শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের ইস্যুতে জামায়াত এবং এনসিপি উভয়েই প্রথম দিকে একই সুরে কথা বলছিল। এটা আগে পরিষ্কার না হলেও এখন পরিষ্কার হিসেবে ধরা দিয়েছে। এনসিপি চাইছিল এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিপত্য থাকবে না। জামায়াতও কৌশলগত কারণে সেই সংস্কারের সুরকে সমর্থন দিয়ে এনসিপির আস্থা অর্জন করে। মূলত ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকতে এবং একক কোনো দলের (বিশেষ করে বিএনপির) একচ্ছত্র আধিপত্য ঠেকাতে তারা আদর্শ সরিয়ে রেখে ‘কৌশলগত ঐক্য’ বা ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতি গ্রহণ করেছে।
জোটভুক্ত না হলে ছোট বা নতুন দলগুলোর পক্ষে আসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, এই নির্বাচনী বাস্তবতা এনসিপিকে চাপের মুখে ফেলে দেয়। প্রথমে তারা এককভাবে লড়ার কথা ভাবলেও পরে বুঝতে পারে যে, জামায়াতের সমর্থন ছাড়া বড় বড় নির্বাচনী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অসম্ভব। অন্যদিকে জামায়াতও বুঝতে পেরেছে, একা নির্বাচন করলে আন্তর্জাতিক মহলে ও দেশের সুশীল সমাজের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে না। এই পারস্পরিক প্রয়োজনই তাদের জোটে আসার মূল প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
তবে এনসিপি-জামায়াত জোট সেই পরিচিত রাজনৈতিক কৌশলের বাইরে গিয়ে এক গভীর আদর্শগত সংকট ও বিভ্রান্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে যার প্রভাব শুধু দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বয়ানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এনসিপির আত্মপরিচয় ও ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক অবস্থানের মৌলিক বিরোধ রয়েছে। এনসিপি নিজেকে যেভাবে রাষ্ট্র সংস্কার, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক কাঠামো ও আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ধারক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, জামায়াত সেখানে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো ও রাষ্ট্রদর্শনের উপর ভিত্তি করে রাজনীতি করা চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেজন্য এই দুই দলের সহাবস্থান কৌশলগত সমঝোতার চেয়েও বেশি কিছু এটি আদর্শ ও নীতিগত আত্মবিরোধ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট আসলে ক্ষমতার অঙ্কে যুক্তিসংগত হলেও আদর্শের বিচারে তা গভীরভাবে অসংলগ্ন। এনসিপির উত্থান ঘটেছে মূলত একটি অভ্যুত্থানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের নতুন আদর্শিক রাজনৈতিক ভাষা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে জামায়াতের রাজনৈতিক ইতিহাস যুদ্ধাপরাধ প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থান এবং ধর্মীয় রাজনীতির কারণে বিতর্কিত ও বিভাজনমূলক। সেজন্য এই দুই ধারার মিলন ভোটের অঙ্কে সাময়িক লাভ এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এনসিপির বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং এরা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।
জামায়াত এনসিপির এই জোটকে কীভাবে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, “এই জোট এনসিপির রাজনৈতিক কৌশল ও বিব্রতকর একটি সিদ্ধান্ত কিন্তু জামায়াতের জন্য এটা ‘পজেটিভ’। জামায়াত মূলতঃ জোট করেছে তরুণ প্রজন্মের ভোট টানার জন্য কিন্তু এটা এনসিপির জন্য ক্ষতি হল”।
তিনি আরও বলেন, “এটা অন্যদিকে এনসিপিরও একটা কৌশল, এনসিপি মূলতঃ নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই জামায়াতের সাথে জোটে গেল, তারা ভেবেছে জামায়াতের সাথে থাকলে হয়তো নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যায় পড়তে হবেনা”।
তিনি আরও যোগ করেন, “রাজনীতিতে তো শেষ বলে কিছু নেই, তবুও এনসিপি যেভাবে জনগণ ও তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে এসেছিলো, জামায়াতের সাথে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এরা নিজেদের অবস্থান নষ্ট করলো ও তরুণ প্রজন্মের আস্থা হারালো”।
এই জোট নিয়ে এনসিপির সিংহভাগ নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, অনেকে তো দলই ছেড়ে দিয়েছেন। এনসিপির অনেক সমর্থকই এসেছে তরুণ, নগরকেন্দ্রিক ও আদর্শগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক পরিসর থেকে- যারা পুরনো ও মান্দাতা আমলের চিন্তাধারার রাজনৈতিক দল এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বাইরে বিকল্প খুঁজছিল। জামায়াতের সঙ্গে জোট সেই বিকল্পের ধারণাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে এনসিপি নিজেই সেই ‘পুরনো রাজনীতির’ অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেটির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা রাজনীতিতে এসেছে।
জামায়াতের জন্য এই জোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ভিন্ন অর্থ বহন করে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকা জামায়াত এই জোটকে ব্যবহার করছে তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন, মূলধারায় ফেরার সিঁড়ি ও তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজেদেরকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করার মাধ্যম হিসেবে। এখানে সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কি জামায়াতের আদর্শগত সমঝোতা নাকি জামায়াতের জন্য কৌশলগত আশ্রয়? বাস্তবতা বলছে, জামায়াত এখন পর্যন্ত তাদের মূল রাজনৈতিক দর্শনে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি, তারা স্বাধীনতার সময়ে যে চিন্তাচেতনা ধারণ করত এখনও সেই আদর্শই ধারণ করছে, ফলে এই জোটে আদর্শগত ছাড় বেশি দিচ্ছে এনসিপিই।
এই জোট বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতি সচেতন মানুষদের একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা দিচ্ছে। একদিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলা, অন্যদিকে এমন একটি দলের সঙ্গে হাত মেলানো যার অতীত ভূমিকা এসব মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই দ্বিচারিতা জামায়াত ও এনসিপির রাজনীতিকে আরও অস্পষ্ট করে তুলছে। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে: দলীয় আদর্শ কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সবই ক্ষমতার হিসাব?
বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরনো সমস্যাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে ‘আদর্শহীন জোট রাজনীতি হিসেবে’। যেখানে দলগুলো দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তার চেয়ে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইতিহাস বলে, এ ধরনের জোট খুব কম ক্ষেত্রেই টেকসই হয় বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের দ্বন্দ্ব, সমর্থক হারানো এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই জোট ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী বার্তা দিচ্ছে? যদি নতুন দলগুলোও পুরনো শক্তির সঙ্গে আপস করেই এগোয়, তবে রাজনীতিতে সত্যিকারের বিকল্পের জায়গা কোথায়? বাংলাদেশের জনগণের কাছে এনসিপি-জামায়াত জোট সেই প্রশ্নটিই আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, এই জোট আসলে একটি ‘অপ্রাকৃতিক রাজনৈতিক মিলন’। এনসিপি যেখানে একটি নতুন আদর্শিক ভাষা নির্মাণের দাবি করছিল, সেখানে জামায়াতের সঙ্গে তাদের আসন ভাগাভাগি প্রমাণ করে যে, ক্ষমতায় যাওয়ার দৌড়ে তারা প্রচলিত ‘পুরনো রাজনীতির’ পঙ্কিল পথেই পা বাড়িয়েছে। এতে করে দলটির প্রতি তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের যে প্রাথমিক উন্মাদনা ছিল, তাতে বড় ধরনের ভাটা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এনসিপির সিংহভাগ নেতা-কর্মী এবং সমর্থক এই জোটকে মেনে নিতে পারছেন না। অনেক নগরকেন্দ্রিক তরুণ সমর্থক, যারা প্রচলিত ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বাইরে বিকল্প খুঁজছিলেন, তারা এখন চরম বিভ্রান্ত। এরই মধ্যে দলটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, এনসিপি তার জন্মের মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। জামায়াতের সঙ্গে এই সখ্য তাদের ‘রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এই জোট দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে। মানুষ যখন একটি সত্যিকারের ‘তৃতীয় শক্তি’ বা প্রথাগত বলয়ের বাইরে নতুন ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা করছিল, তখন এনসিপি-জামায়াত জোট সেই প্রত্যাশাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করছে যে, বাংলাদেশে রাজনীতির নাম পাল্টালেও শেষ পর্যন্ত তা ‘আদর্শহীন জোট রাজনীতি’ হিসেবেই আবর্তিত হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এই জোট হয়তো এনসিপিকে কিছু আসন এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি এনসিপিকে রাজনীতির মাঠে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে। ইতিহাস সাক্ষী, আদর্শ বিসর্জন দিয়ে গঠিত কোনো জোটই জনগণের দীর্ঘস্থায়ী আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এনসিপি কি তবে নিজের অজান্তেই জামায়াতের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সিঁড়িতে পরিণত হলো? এই প্রশ্নটিই এখন দেশের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
-এম. এইচ. মামুন










