ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ন্ত্রণের স্বপ্ন ট্রাম্পের: বাস্তবায়নে কেন পাহাড়সম বাধা?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ থেকে অর্থ সংগ্রহের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ‘চালিয়ে’ রাখবে এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পরিত্যক্ত সম্পদ সংগ্রহ করবে। কিন্তু ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা যতটা সহজ শোনাচ্ছে, বাস্তবক্ষেত্রে তা ততটাই জটিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বের বৃহত্তম মজুদ, অথচ উৎপাদনে তলানিতে
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদের দেশ, যার পরিমাণ আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট তেলের মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশ। ১৯৭০-এর দশকে দেশটি প্রতিদিন ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতো। কিন্তু গত বছর এই উৎপাদন গড়ে মাত্র ১১ লাখে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ। গত নভেম্বরে উৎপাদন ছিল মাত্র ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল।

কেন এই বিপর্যয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র (PDVSA) ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং দক্ষ বিদেশি কর্মীদের চলে যাওয়ার ফলে এই ধস নামে। এছাড়া ২০১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

ট্রাম্পের সামনে প্রধান ৫টি চ্যালেঞ্জ:

১. ভঙ্গুর অবকাঠামো: ইনভেস্টেকের পণ্য প্রধান ক্যালাম ম্যাকফারসন বলেন, ভেনেজুয়েলার আসল চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ভেঙে পড়া অবকাঠামো। এটি মেরামত করে উৎপাদন লাভজনক পর্যায়ে নিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে।

২. দীর্ঘ সময়: ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ নীল শিয়ারিং মনে করেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত এক দশক সময় লাগবে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।

৩. তেলের মান: ভেনেজুয়েলার তেল মূলত ‘ভারী ও টক’ (Heavy and Sour), যা পরিশোধন করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ। যদিও এটি দিয়ে ডিজেল ও পিচ উৎপাদন ভালো হয়, তবুও আধুনিক রিফাইনারি ছাড়া এর বাণিজ্যিক মূল্য কম।

৪. রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তা: কেপলারের বিশ্লেষক হোমায়ুন ফালাকশাহি বলেন, তেল উত্তোলনের জন্য সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির প্রয়োজন, যার জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে বড় বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

৫. বাজার দখল: এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান ক্রেতা থাকলেও এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে চীন। এই বাজার সমীকরণ পাল্টানোও ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও কোম্পানির অবস্থান
ট্রাম্পের ঘোষণার পর মার্কিন তেল জায়ান্ট শেভরনের সাবেক প্রধান নির্বাহী আলী মোশিরি ভেনেজুয়েলা প্রকল্পের জন্য ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছেন। তিনি জানান, বহু সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ইতিমধ্যে আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে শেভরনই একমাত্র মার্কিন কোম্পানি যারা বিশেষ লাইসেন্সের অধীনে সেখানে কাজ করছে। অন্যদিকে কনোকোফিলিপস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, তবে এক্সনমোবিল বা শেলের মতো বড় কোম্পানিগুলো এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

উপসংহার
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইছেন মার্কিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে। তবে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক পিটার ম্যাকনালির মতে, কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি সেখানে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে হবে। ট্রাম্পের ‘তেল মিশন’ শেষ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও আর্থিক চোরাবালিতে পরিণত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।