সাবিনা নাঈম
অনেকেই শখ করে বিড়াল পুষে থাকেন। এই প্রাণীটি দেখতে এত অদ্ভুত সুন্দর হয়ে থাকে, যে সবারই মন চায় একে আদর করতে। এই প্রাণীটাও খানিকটা আদর পেয়ে আদুরে ভঙ্গিতে নিজেদের আরও বেশি এগিয়ে দেয় আদর নেয়ার জন্য। এই আদুরে সুন্দর প্রাণীটি কথা বলতে না পারলেও শরীরের বিভিন্ন ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় যে তারাও ভালোবাসার বিপরীতে ভালোবাসতে পারে।
বিড়াল মানব সমাজে বহু বছর ধরে প্রিয় পোষা প্রাণী হিসেবে পরিচিত। শিশু বিড়াল থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক বিড়াল, এরা আমাদের বাড়ির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিড়াল কেন এত জনপ্রিয় পোষা প্রাণী বা নতুন প্রজন্ম কেন বিড়ালের প্রতি আকৃষ্ট?
মানুষ আর বিড়ালের বন্ধুত্ব এখন এত স্বাভাবিক যে, মনে হয় যুগ যুগ ধরে যেন এভাবেই চলছে। বিড়াল গৃহপালিত হলেও এরা একেবারেই স্বাধীনচেতা প্রাণী। তাই বিজ্ঞানীরাও অনেক দিন ধরে মানুষের সঙ্গে এই সুন্দর প্রাণীর সম্পর্ক খুঁজছেন।
কবে, কোথায়, কেন মানুষ ও বিড়াল একসঙ্গে থাকা শুরু করেছিল? মানুষ আর বিড়ালের সহাবস্থান শুরু হয়েছে ১০ হাজার বছর আগে। এই সময়ে বিড়ালের আকার ছোট হয়েছে। তাদের গায়ের লোমের রং বদলেছে। আগের তুলনায় বিড়াল অনেক মিশুক স্বভাবের হয়েছে। বন্য বিড়ালগুলো প্রথমে মানুষের বসতিতে খাবারের খোঁজে আসতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে আমাদের পাশে বাস করার জন্য অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তাদের পূর্বপুরুষ ফেলিস লিবিকা ছিল, যা প্রাচীন যুগে মিসরের কাছে ছিল। মিসরে বিড়ালরা বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো এবং তাদের দেবতা হিসেবে পূজা করা হতো।
বিড়ালদের প্রতি কম যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে তাদের ভালোবাসা ও মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিড়ালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের আদর্শ পরিবেশে সহজভাবে বসবাস করার ক্ষমতা। শহরের বা ছোট বাড়ির পরিবেশেও তারা খুব ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। এ কারণে বিশেষ করে যারা অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন, তাদের জন্য বিড়াল আদর্শ পোষা প্রাণী।
এখনকার গৃহপালিত বিড়ালরা তাদের শহরের বা ছোট বাড়ির মধ্যে শিকার বজায় রেখেছে। তারা শিকার করলেও তাদের মূল খাদ্য ব্যবস্থা সাধারণত মানব দ্বারা সরবরাহ করা হয়। বিড়ালরা মাংসাশী প্রাণী, তাই তাদের খাবারে মাংসের পরিমাণ বেশি থাকা উচিত।
বিড়ালের লিটার বক্স নিয়মিত পরিষ্কার করা খুবই জরুরি, কারণ এতে দুর্গন্ধ দূর হয়, জীবাণু সংক্রমণ কমে এবং বিড়ালের স্বাস্থ্য ও আচরণ ভালো থাকে। সপ্তাহে অন্তত একবার পুরো লিটার পরিবর্তন করে সাবান পানি দিয়ে বক্স ধোয়া উচিত, যা বিড়ালের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
বিড়ালকে নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন শুধু তার সুরক্ষাই নিশ্চিত করে না, বরং মারাত্মক ভাইরাস যেমন রেবিস, প্যানলিউকোপেনিয়া, ক্যালিসিভাইরাস, হারপিসভাইরাস, ফ্লুসহ নানা জটিল ও মরণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাই আগে থেকেই আপনার বিড়ালকে ভ্যাকসিন দিয়ে নিরাপদ রাখুন। তাই দেরি না করে আজই আপনার বিড়ালকে ভ্যাকসিন দিন।
বিড়াল পোষার কারণে অনেক মানসিক এবং শারীরিক সুবিধা রয়েছে। বাড়িতে বিড়াল থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিড়াল পোষেন; তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি অন্যদের থেকে ৩০ শতাংশ কম। বিড়ালদের স্নেহময় আচরণ ও মিউ মিউ শব্দ শোনার মাধ্যমে মানুষ অনেকটা শান্তি অনুভব করতে পারে। বিড়ালের মিউ মিউ ডাক বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ধ্বনিগুলোর একটি, যা শরীরের পেশি ও অস্থির প্রদাহ নিরাময়ে থেরাপির মতো কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল ২০-১৪০ হার্জ শব্দ উৎপাদন করে। ফলে এটা অস্থিসন্ধি ও পেশির চিকিৎসায় থেরাপি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের উপস্থিতি অনেক সময় একাকিত্ব ও বিষণ্নতা কমানোর জন্য সহায়ক।
গবেষণা বলছে, বিড়ালের উপস্থিতিতে ঘুম খুব ভালো হয়। মায়োক্লিনিক সেন্টার ফর স্লিপ মেডিসিনের পরামর্শ অনুযায়ী, ঘুমের সঙ্গী হিসেবে বিড়ালকে রাখতে পারেন। যখন কেউ বিড়ালের সঙ্গে সময় কাটায়, তখন তাদের দেহে প্রশান্তি ও আরামদায়ক রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যক্তির রাগ, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বিড়াল আপনার অবসর সময়ের খুব ভালো একজন বন্ধু ও সঙ্গী হতে পারে, যা আপনাকে আনন্দ ও প্রশান্তি এনে দেবে।
বিড়াল অত্যন্ত জনপ্রিয় পোষা প্রাণী, যা তাদের সহজ পরিচর্যা ও সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতার কারণে মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। বিড়ালদের মধ্যে অনেক প্রজাতি এবং প্রতিটি প্রজাতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আপনি যদি বিড়াল পোষার কথা ভাবছেন, তবে তাদের বিভিন্ন প্রজাতির এবং তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আগাম জানাশোনা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে, বিড়ালের সঠিক যত্ন ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিড়ালদের প্রতি স্নেহ, যত্ন এবং সময় দেওয়া তাদের জন্য যেমন উপকার হতে পারে এবং আপনার জীবনেও সুখ ও শান্তি নিয়ে আসতে পারে।










