সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো ছিল মূলত ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং এসব অপরাধের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় এসব তথ্য জানানো হয়।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও প্রকৃত সংখ্যা
কমিশন জানিয়েছে, তদন্তে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এছাড়াও ২৮৭টি অভিযোগ ‘নিখোঁজ ও মৃত’ (Missing & Dead) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। অনেক ভিক্টিম বা তাদের পরিবার এখনো আতঙ্কে কথা বলতে রাজি হননি কিংবা অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ভিক্টিমদের পরিচয়
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন তাদের ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপির। অন্যদিকে, যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এটি ছিল একটি ‘পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ।
সরাসরি সম্পৃক্ত যারা
হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আযমী এবং ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের মতো আলোচিত গুমের ঘটনাগুলো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অনেককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে ভারতে হস্তান্তর (রেন্ডিশন) করার তথ্যও পাওয়া গেছে।
যেখানে গুম করা হতো লাশ
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে লাশের গণকবর ও গুম করার ভয়াবহ সব জায়গার তথ্য। কমিশন জানায়, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী এবং মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুম করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রধান উপদেষ্টা এসব জায়গার ম্যাপিং করার এবং ‘আয়নাঘর’সহ সব গোপন বন্দিশালার তথ্য জনসমক্ষে আনার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই রিপোর্ট প্রমাণ করে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কতটা পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে। যারা এই নৃশংসতা ঘটিয়েছে, তারা সমাজের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। জাতি হিসেবে আমাদের এই নৃশংসতা থেকে চিরতরে বের হয়ে আসতে হবে।” তিনি এই রিপোর্ট সহজ ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান।
কমিশন সদস্যরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেন। অনুষ্ঠানে কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ অন্যান্য সদস্য এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।










