গত বছর বাজারে পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক ভালো থাকায় কৃষকরা লাভবান হন। মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩৫–৪০ টাকায় বিক্রি হলেও নভেম্বর–ডিসেম্বরে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ থেকে ১৩৫ টাকায়। বর্তমানে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮৫–৯০ টাকায়। অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ কেজিতে গড়ে ২২–২৫ টাকা হওয়ায় কৃষকরা এখনও লাভের আশা করছেন। আগের মৌসুমের ভালো ফলনের কারণে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ বেড়েছে এবং মাঠজুড়ে চারা রোপণের ব্যস্ততা চলছে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় চাষিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের একটি সিন্ডিকেটের কারণে ইউরিয়া ছাড়া টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের সরবরাহ ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দিলেই সাবডিলার বা খোলাবাজারে এসব সার মিলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের তথ্যমতে, কুমারখালী উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯২০ হেক্টর। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের ধারণা, এবার পেঁয়াজ আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কয়েক বছর আগেও এই উপজেলায় মূলত শীতকালীন পেঁয়াজের আবাদ হতো। তবে অসময়ে ভালো দাম পাওয়ায় এখন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষেও ঝুঁকছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে ১৭৪ হেক্টর জমিতে নাসিক এন–৫৩ জাতের পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষ ও পরিচর্যা মিলিয়ে প্রতি হেক্টরে গড়ে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। তাঁদের দাবি, সারের ঘাটতি নেই।
বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ২০–৩০ জনের দলে কৃষক, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে চারা রোপণের কাজে ব্যস্ত। তারা জানান, রোপণের মৌসুমে শ্রমিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।
ভালুকা গ্রামের কৃষক লাল্টু আলী শেখ জানান, গত বছর পেঁয়াজের ভালো দামের কারণে অনেকে অন্য ফসল ছেড়ে পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকেছেন। তিনি তিন বিঘা জমিতে চাষ করলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাননি বলে অভিযোগ করেন।
আরেক কৃষক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে অল্প পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে, অথচ সাবডিলাররা পুরো বস্তা ধরে বেশি দামে সার বিক্রি করছে। তাঁর অভিযোগ, ডিলারদের যোগসাজশেই সাবডিলারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি হচ্ছে।
অন্য কৃষকদের ভাষ্যও একই—বিঘাপ্রতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম সার দেওয়া হচ্ছে, ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোলাবাজারে সরকারি দামের তুলনায় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে কয়েকজন কৃষক সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ন্যায্যমূল্যে ও পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে, কিছু সাবডিলার অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে জেলা পর্যায়ের সার ডিলার সমিতির সভাপতি স্বীকার করেছেন, সরকারিভাবে চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ না পাওয়ায় ডিলাররা সংকটে পড়ছেন। তাঁর মতে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাইরে থেকে সার এনে বেশি দামে বিক্রি করছে, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং কৃষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে সরকারি দামে সার দেওয়া হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, যদি সার নিয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্যে ও প্রয়োজন অনুযায়ী সার পান, সে জন্য প্রশাসন মাঠপর্যায়ে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
আফরিনা সুলতানা/










