এলপিজি নিয়ে হাহাকার: ১২০০ টাকার গ্যাস ১৮০০ টাকায়ও মিলছে না

রাজধানীর বাজারে এলপিজি (রান্নার গ্যাস) নিয়ে চরম অরাজকতা শুরু হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডার প্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও ১ হাজার ২৫৩ টাকার ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়। তীব্র সরবরাহ সংকটের অজুহাতে খুচরা বিক্রেতারা সাধারণ গ্রাহকদের পকেট কাটছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর ও মিরপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সিলিন্ডারের তীব্র সংকট। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কাওসার খান জানান, পাড়ার দোকানে সিলিন্ডার না পেয়ে অনেক কষ্টে এক দোকান থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় গ্যাস কিনেছেন। কল্যাণপুরের ফারজানা নীলার অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত; তাকে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গুনতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে মিরপুরের কাজীপাড়ায়। সেখানে আসমা আখতার নামের এক নারী জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা। অথচ ডিসেম্বরে সরকার নির্ধারিত দাম ছিল মাত্র ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অর্থাৎ একটি সিলিন্ডারে তাকে বাড়তি দিতে হয়েছে ৮৪৭ টাকা।
কেন এই সংকট?
ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং জাহাজ সংকটের কারণে দেশে এলপিজি আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত নিয়মিত ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্রে জানা গেছে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়; কিন্তু ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে মাত্র ৯০ হাজার টন, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম।
সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান জানান,

“কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ১ হাজার সিলিন্ডার চাইলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি। ফলে ট্রাকের খরচ বাড়ছে এবং কোম্পানিগুলোও সিলিন্ডার প্রতি ৭০-৮০ টাকা বাড়তি নিচ্ছে।”

২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বাড়তি দামের বিষয়টি নজরে আসায় আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, তারা নির্ধারিত দামেই পরিবেশকদের দিচ্ছেন, কিন্তু খুচরা বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।
এদিকে বিইআরসির বাজার তদারকি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, “সরবরাহ নেই বলা হলেও বেশি দামে ঠিকই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এটা স্পষ্টত আইনত অপরাধ। বিইআরসি শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না বলেই এই নৈরাজ্য চলছে।”
আগামী ৪ জানুয়ারি বিইআরসি নতুন গ্যাসের দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে। আমদানিকারকরা বলছেন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব বিবেচনায় নতুন মূল্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাধারণ ভোক্তাদের দাবি, দাম যা-ই নির্ধারণ হোক, সরকার যেন নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।

 

-এম এইচ মামুন