ড. ইউনূসের সঙ্গে কেন জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ হলো না?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পাঠানো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তাটিকেও প্রতিবেশী দেশটির ‘রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পাকিস্তান, ভুটান ও নেপালের প্রতিনিধিরা এলেও কেবল পাকিস্তানের স্পিকার ও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেই প্রধান উপদেষ্টার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হয়েছে। জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাহবুবুল আলম জানান, সফর সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এটি সম্ভব হয়নি। তবে জয়শঙ্কর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলেছেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন একে স্রেফ ‘সৌজন্যতা’ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, অনুষ্ঠানে জনসম্মুখে দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আলোচনার সুযোগ ছিল না। তবে এই সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির বিদ্যমান ‘শীতল’ সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদি যে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, সেখানে তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, “আমি বিশ্বাস করি আপনার দক্ষ নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার আদর্শ এগিয়ে যাবে… এবং ভারত-বাংলাদেশের অংশীদারত্ব সমৃদ্ধ করতে তা পথনির্দেশক হবে।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বার্তার মাধ্যমে ভারত স্পষ্টত বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের ‘দূরত্ব’ বা ‘অবিশ্বাস’ কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, “ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে এমন ধারণা থেকেই হয়তো ভারত এখন বিএনপিকে তাদের প্রধান অপশন হিসেবে বিবেচনা করছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, “গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আবেগ বুঝতে ভারত যে ভুল করেছিল, এই সফর ও শোকবার্তা তারই সংশোধনী বা ডেমন্সট্রেশন।” তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জয়শঙ্করের বৈঠক না হওয়াকে নেতিবাচক না দেখে তিনি এটিকে সময়ের অভাব হিসেবেও দেখতে চান।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট করেছে। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শক্তির (বিএনপি) সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ হওয়ার বার্তা বেশি প্রবল ছিল। শোক প্রকাশের এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ভারত মূলত বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের ‘বন্ধুত্বের হাত’ নতুনভাবে প্রসারিত করার কৌশল নিয়েছে।

-এম এইচ মামুন