ছদ্মবেশী বীরের করুণ আখ্যান: পাকিস্তানিদের বাঙ্কার ম্যাপকারী কবি কফিল উদ্দিন উপেক্ষিতই থেকে গেলেন।

উত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের নিভৃত পল্লীর কবি কফিল উদ্দিন আহমদ সরকারের (প্রকৃত নাম কাশেম আলী জীবন সংগ্রামের এক বেদনাবিধুর চিত্র উঠে এসেছে। দিনাজপুর জেলার শ্রেষ্ঠ কবি এবং ঘোড়াঘাট উপজেলার একমাত্র লেখক হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারগুলোর গোপন ম্যাপ তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও তিনি আজও মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্তির সম্মান পাননি। উল্টো, স্বীকৃতির আশায় প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে খুইয়েছেন অর্থ।

১. দিনমজুরের ছদ্মবেশে বাঙ্কারের ম্যাপ সরবরাহ

কবি কফিল উদ্দিন আহমদ সরকার বাংলা ১৩৩৮ সনের ৪ঠা আষাঢ় (দিনাজপুর জেলার পালশা গ্রামে) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই অভিভাবক হারানোর পর চরম দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যান এবং তাঁর সাতটি বই প্রকাশিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দুঃসাহসিক অবদান:

* যুদ্ধের সময় তিনি হিলি সীমান্ত এলাকায় দিনমজুরের ছদ্মবেশে পাকিস্তানিদের কাজ করে দেওয়ার কৌশলে তাদের অবস্থানে প্রবেশ করতেন।

* অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তিনি পায়ে হেঁটে হেঁটে দূরত্ব মেপে পাকিস্তানি সেনাদের বাঙ্কার এবং তাদের সামরিক অবস্থানের ম্যাপ তৈরি করেন।

* এই সব গোপন ম্যাপ ও তথ্য তিনি ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন, যা রণকৌশলে সহায়ক হয়।

তাঁর লেখা ‘জয়বাংলা’ পান্ডুলিপি খুঁজতে এসে পাকবাহিনী তাঁকে হত্যার জন্য দু’বার ধরে নিয়ে যায়। প্রথমবার ঘোরাঘাটের ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধা মো: বদর এবং দ্বিতীয়বার সহযোদ্ধা গাজিউর তাঁকে বাঁচান।

২. স্বীকৃতি মেলেনি, শিকার হয়েছেন প্রতারণার

এত বড় আত্মত্যাগ ও জীবনের ঝুঁকি নেওয়া সত্ত্বেও কবি কফিল উদ্দিনের নাম আজও গেজেটভুক্ত না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী নেতারা প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর জন্য যথেষ্ট ভূমিকা রাখেননি। বর্তমানে তিনি হাইকোর্টের মাধ্যমে অন্তত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

প্রতারণার শিকার: এই স্বীকৃতির আশায় তিনি বারবার প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন:

* রিষিঘাট এলাকার মুক্তিযোদ্ধা দাবীদার নাসিম সহযোগিতার কথা বলে প্রথমে ৩৮,০০০ টাকা হাতিয়ে নেন।

* আন্ধিয়ার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দাবীদার আনোয়ার নামক একজন প্রতারক ১০ হাজার টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান।

৩. ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার উত্থান ও কবির আক্ষেপ

কবি যখন গেজেটভুক্তির জন্য লড়ছেন, তখন অযোগ্যদের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার ঘটনা তাঁকে ব্যথিত করে। অভিযোগ রয়েছে, যুদ্ধের সময় শরণার্থীদের মালপত্র আত্মসাৎকারী পালশার বগা চোর-এর মতো ব্যক্তিও তদবিরের মাধ্যমে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও সংগ্রামী লেখক হিসেবে কবি কফিল উদ্দিনের এই বঞ্চনা দ্রুত নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সচেতন মহল।

সাকিব হাসান নাইম  (ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর)