হাদি হত্যাকাণ্ডে প্রধান আসামি ফয়সাল ও তাঁর সহযোগী ভারতে পালিয়েছে : পুলিশ

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর খুনিদের পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পূর্তি ও সামি নামে দুই সহযোগীকে আটক করেছে সেখানকার পুলিশ।
রোববার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত। ফয়সালসহ আরও একজন ময়মনসিংহের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালিয়েছে। এই ঘটনায় ডিএমপি মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে ছয় জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার চার্জশিট আগামী ৭-৮ দিনের মধ্যে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ঘটনার দিনই হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল ও মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা হয়। তাৎক্ষণিক তাদের গ্রেফতারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম সাভার, হেমায়েতপুর, আগারগাঁও, নরসিংদীতে অভিযান পরিচালনা করে। ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে ডিএমপির একটি টিম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় জব্দ আলামতের মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন, ছোরা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, ভুয়া নম্বরপ্লেট, হাদিকে বহনকারী অটোরিকশা, ৫৩টি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন, গ্রেফতারদের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘটনার পরপরই ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে সিএনজি করে আমিনবাজারে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকে মানিকগঞ্জের কালামপুর যায়। সেখান থেকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাইভেটকারে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছায়। আসামিদের চিহ্নিত করার আগেই তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। হালুয়াঘাটের আগে মুন ফিলিং স্টেশনে জনৈক ফিলিপ এবং সঞ্জয় তাদের গ্রহণ করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফিলিপ তাদের সীমান্ত পার করার পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জনৈক পুত্তির কাছে হস্তান্তর করে। পুত্তি ট্যাক্সি ড্রাইভার সামীর কাছে তাদের হস্তান্তর করে। সামী মেঘালয় রাজ্যের তুরা নামক জায়গায় তাদের পৌঁছে দেয়।
অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, তারা এরই মধ্যে পুত্তি ও সামীকে গ্রেফতার করেছে। আমরা সন্দেহ করি, আসামিরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। এ ঘটনায় বিভিন্নভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গ্রেফতারদের মধ্যে ছয়জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া চারজন ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেককেই শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সবার নাম বলা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে এটাকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই মনে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে পল্টন থানার বক্স কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে আসা ফয়সাল করিম ও তার অজ্ঞাত পরিচয় সহযোগী চলন্ত অবস্থায় শরিফকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুরুতর আহত শরিফকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুরে প্রেরণ করা হয়, যেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। পরে হাদির মৃত্যুর পর ২০ ডিসেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা) সংযোজনের আদেশ দেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক/