গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর মোট ২,৬৭৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে অন্তত ৯০ জন সংখ্যালঘু নাগরিক হত্যা ও রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭৩টি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে চলতি ডিসেম্বর মাসেই দিপু চন্দ্র দাসসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার: বর্তমান বাস্তবতা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিওর সভাপতিত্বে আয়োজিত বৈঠকে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার দাবি জানানো হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হচ্ছে না; এর পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। তিনি বলেন, দলবাজি, দখলবাজি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এসব হামলার মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কলুষতার কারণে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সংখ্যালঘুবিরোধী চর্চার ধারকে পরিণত হয়েছে এবং নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের প্রস্তাবনায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। পাশাপাশি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংখ্যালঘু ও জাতিগত নিপীড়নের ঘটনায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বভৌমত্বকেই দুর্বল করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিবেশী ভারতকে যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করছে, একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নাগরিকদের দেখা যাবে না। ভারতের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে যে আচরণ হচ্ছে, তা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জীবনমান ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে উৎসাহিত করছে। তবে ভারতবর্ষে কী ঘটছে, তার দায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নয়।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
তিনি জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও কিশোর-কিশোরীরা হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণ, উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক বাড়িঘর, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল, শারীরিক নির্যাতন, কর্মস্থল থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধা, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের শিকার হচ্ছে। চলমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব অপরাধকে আরও উৎসাহিত করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এমইউএম/










