জৌলুস হারাচ্ছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের নৌপথ ব্যবস্থা

হাজার বছর আগে যে নৌপথ ধরে এই দেশের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় সেই নৌপথের বাণিজ্যিক যাত্রা এখন কমে এসেছে। দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের চাক্তাই খাতুনগঞ্জ থেকে এক সময় সারাদেশে নৌপথে পণ্য পরিবহণ হতো। এখন সংকুচিত হয়ে আসছে এই ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার।

চাক্তাই খাতুনগঞ্জ থেকে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নোয়াখালীর হাতিয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে চাক্তাই খালের কর্ণফুলী মোহনায় নির্মিত স্লুইচ গেটের কারণে বড় ট্রলার প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ থেকে আলাদা পরিবহন ভাড়া করে নৌকাতে পণ্য বোঝাই করতে হচ্ছে। এতে প্রতি বস্তা পণ্য পরিবহনে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এছাড়া চাক্তাই খালের নাব্যতা হারানোর কারণেও নৌপথে পণ্য পরিবহন কমে গেছে।

জানা যায়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য কর্ণফুলী নদী থেকে প্রবাহিত চাক্তাই, রাজাখালী ও বদরশাহ এ তিনটি খালের উপকণ্ঠে ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠেছে হরেক রকমের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। এই বাজারের গোড়াপত্তন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও চট্টগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নদী ও খালের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের বাড়তি সুবিধা নিয়ে ১৩’শতকে সুলতানি আমলে তৎকালীন চাটগাঁ’র শুলকবহর ও চকবাজার এলাকায় পাইকারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন কয়েকজন বনেদি ব্যবসায়ী। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কাছাকাছি হওয়ায় দ্রুত এই ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। ক্রমে সেটা আরও ছড়িয়ে পড়তে পড়তে খাতুনগঞ্জে এসে থিতু হয়। তবে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের নৌপথে পণ্য পরিবহণ ১০ শতাংশে চলে আসে। বর্তমানে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে কোটি কোটি টাকার ভোগ্য পণ্য বোয়ালখালী, বাঁশখালী, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী, হাতিয়া ও সুবর্ণচরের ব্যবসায়ীরা নৌপথেই নিয়ে যায়।

এক সময় চাক্তাই খালে অনেকগুলো ছোট ছোট ঘাট ছিল। যেখান থেকে সরাসরি ব্যবসায়ীরা পণ্য উঠানামা করতে পারতেন। এখন স্লুইচ গেটের এক পাশ দিয়ে ছোট নৌকা প্রবেশ করতে পারছে। নির্মাণগত ত্রুটির কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাণের সময় ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানালেও তা আমলে নেয়নি সিডিএ।

মাঝিরা জানিয়েছে, নৌকা-সাম্পানে মালামাল বোঝাই করে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, বোয়ালখালীতে পৌঁছানো হয়। কর্ণফুলী নদীতে জোয়ারের সময় এসব নৌকা-সাম্পান গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। তবে চাক্তাই খাল ভরাট হওয়ায় নৌ চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। একসময় পণ্য যেত চাঁদপুর ও খুলনা পর্যন্ত। এখন সেটা কেবলই স্মৃতি।

জানা যায়, চাক্তাই এবং খাতুনগঞ্জে পণ্য নৌযানে বোঝাই করার জন্য কাজ করছে কয়েকশ শ্রমিক। এসব শ্রমিকরা মাঝিদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। শ্রমিকদের মধ্যে অধিকাংশই চট্টগ্রামের বাইরের জেলার।

স্থানীয় বশির মাঝি জানান, আমি ৩৬ বছর ধরে খাতুনগঞ্জে কাজ করছি। একসময় এখানে ছিল রমরমা অবস্থা। নৌকা-সাম্পান আর ট্রলারে অধিকাংশ পণ্য বোঝাই করে দিতো কিংবা খালাস করতো শ্রমিকরা। এখন সড়কপথেই বেশি পণ্য পরিবহণ হয়।

ইসলামাবাদ রাইস মিলের আব্দুর রহমান বলেন, আগে দিনাজপুর-নওগাঁ থেকে ধান আসত চট্টগ্রামে। সেই ধান থেকে চাল করে আবার ফিরিয়ে দিতাম। এখন উল্টো হচ্ছে-আমরা ধান পাঠাচ্ছি, ওরা চাল পাঠাচ্ছে। জেলায় জেলায় আধুনিক কারখানা হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসা কমে গেছে।

চট্টগ্রাম রাইচ মিলস মালিক সমিতির সভাপতি রফিক উল্লাহ বলেন, আমাদের চাক্তাইয়ে নোয়াখালীর হাতিয়া, সুবর্ণচর এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থেকে প্রচুর পরিমাণে ধান আসতো। এছাড়া কঙবাজারের মহেশখালী এবং কুতুবদিয়ায় এখান থেকে চাল পরিবহন হতো। কিন্তু বর্তমানে স্লুইচ গেটের কারণে চাক্তাই খালের ঘাটে বড় নৌকা ভিড়তে না পারাসহ নানা কারণে নৌপথে পণ্য পরিবহন অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে নৌপথে মাত্র ১০ শতাংশের মতো পণ্য পরিবহন হচ্ছে।

চাক্তাই আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, স্লুইচ গেট নির্মাণের কারণে এখন আর ব্যবসায়ীদের দোকান–গুদামে পানি প্রবেশ করছে না। তবে এখানে স্লুইচ গেটের প্রবেশমুখ ও উচ্চতা আরেকটু বাড়ানো হলে চাক্তাই খালে সহজেই বড় নৌকা প্রবেশ করতে পারতো। স্লুইচ গেট নির্মাণ কাজ শুরুর আগে আমরা তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম-স্লুইচ গেট দিয়ে যেন বড় নৌকা প্রবেশ করার ব্যবস্থা রাখা হয়। এখন সেটি না হওয়ায় আমাদেরকে দুইবার নৌকায় করে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এখন আবার খালের একপাশ ভরাট করার কারণে ছোট নৌকাও ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারছে না। অথচ এক সময় চাক্তাই খালে ৮–১০টি বড় নৌকা দাঁড়িয়ে থাকতো।

-বেলাল