জন্মদিন মানেই আলো, কোলাহল আর কেক কাটার হাসি। কিন্তু এ বছর ইলিয়াস কাঞ্চনের জন্মদিন শুরু হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহে। নেই কোনো উৎসব, নেই ক্যামেরার ঝলকানি।
লন্ডনের এক বাসার নীরব চার দেয়ালের ভেতর, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা আর প্রার্থনার ভরসায় কেটে যাচ্ছে তাঁর বিশেষ দিন। ব্রেন টিউমারের সঙ্গে লড়াই করছেন এই বরেণ্য অভিনেতা—যিনি পর্দায় বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।
১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার আশুতিয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পারিবারিক নাম ইদ্রিস আলী। এক সময় জন্মদিন মানেই সহকর্মী ও অনুরাগীদের ভালোবাসায় ভেসে যাওয়া। কিন্তু এবারের জন্মদিন সেই চেনা রূপে নেই। প্রায় সাত মাস ধরে তিনি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ছয় মাস ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন, মেয়ে ইসরাত জাহানের বাসায় থেকেই চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।
ইলিয়াস কাঞ্চনের শিল্পী হয়ে ওঠার পথটি ছিল ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক সংগ্রামের গল্প। ছাত্রজীবনে নাটক, স্কাউটিং আর সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়েই তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটে। মঞ্চনাটক করতে করতেই ঘটনাচক্রে চলচ্চিত্রে আসা। ১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু। চরিত্র বোঝার জন্য বই পড়া, অভিনয়ের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া—নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। বাকি অংশ রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও মানসিকভাবে এই সময়টা তাঁর জন্য ভীষণ কঠিন। তাই জন্মদিনে কেক কাটার আগ্রহও দেখাননি তিনি।
পরবর্তী সময়ে ‘আঁখি মিলন’, ‘ভেজা চোখ’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘মাটির কসম’, ‘প্রেম প্রতিজ্ঞা’, ‘বাঁচার লড়াই’সহ অসংখ্য ছবিতে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দর্শকের মন জয় করেন। রোমান্টিক আবেগ হোক বা সামাজিক প্রতিবাদ—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি এনেছেন বিশ্বাসযোগ্যতা ও গভীরতা।
চলচ্চিত্রের বাইরে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। স্ত্রীকে হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা থেকেই জন্ম নেয় এই সামাজিক সংগ্রাম। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নিরলসভাবে তিনি লড়ছেন সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে, কখনো রাজপথে, কখনো মানুষের সচেতনতার ভেতর দিয়ে।
আজ জন্মদিনে তিনি হয়তো ক্যামেরার সামনে নেই। কিন্তু কোটি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর প্রার্থনায় তিনি ঘিরে আছেন। যিনি সারা জীবন অন্যের জীবনের নিরাপত্তার কথা বলেছেন, আজ তাঁর জন্যই সবার একটাই কামনা—ইলিয়াস কাঞ্চন যেন সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে, এমনকি ক্যামেরার সামনেও ফিরে আসেন।
বিথী রানী মণ্ডল/










