বাংলাদেশ–জাপান ইপিএ’র খসড়া চূড়ান্ত, আগামী মাসে সইয়ের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) খসড়া চুড়ান্ত হয়েছে। আগামী মাসে চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি আলোচনা বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তি সম্পাদিত হলে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশের ৭,৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে জাপানের ১,০৩৯ টি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। উভয় দেশের মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষের পর এটি আগামী মাসে স্বাক্ষরিত হবে।

বাংলাদেশ প্রথম অন্য কোন দেশের সঙ্গে এ ধরনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটি এমন একটি চুক্তি যার কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, এবং যতদিন কোনো পক্ষ এই চুক্তি বাতিল না করবে, ততদিন চলবে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ হলো দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরির কাঠামো। বাণিজ্য বাধা দূর, শুল্ক কমানো এবং একে অন্যের সঙ্গে পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য এ ধরনের চুক্তি দুটি দেশ করে থাকে। যাতে দীর্ঘমেয়াদে ওই দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, আমরা ২০২৪ সালের শেষে এ চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। আট দফা বৈঠক শেষে এখন চুক্তিটি চুড়ান্ত হয়েছে।

পোশাক অন্তর্ভুক্ত, চামড়া আপাতত বাদ

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এই পণ্যের তালিকায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক রয়েছে। তবে চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকা রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনই এই চুক্তির সুবিধা পাবে না, কারণ এসব পণ্য আপাতত চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে। যদিও জাপান থেকে রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে চুক্তির খসড়ায়।

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর ফলে, বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।

এলডিসি উত্তরণের পর বাজার সুবিধা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান টিবিএসকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা থাকবে। “এখন যে ইপিএ হচ্ছে এটি এলডিসি উত্তরণের পরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ধরে রাখতে সহায়তা করবে। শুরুতেই সব পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে এমন নয়, ধীরে ধীরে এই চুক্তির সুবিধা পাওয়া যাবে।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পণ্য তৈরি করে। আর জাপানের বাজারে বেশিরভাগ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড রয়েছে, ফলে বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি কমবে না। অন্যদিকে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সেজন্য বিনিয়োগে যেসব ব্যারিয়ার রয়েছে সেগুলো সরকারকে দূর করতে হবে।

এই চুক্তি বাস্তবায়নের শুরুতে জাপান থেকে বাংলাদেশে ইস্পাত ও কিছু কাঁচামালের রপ্তানি বাড়বে। আবার নতুন গাড়ি, হাইব্রিড গাড়ি চুক্তির আওতায় থাকলে সেগুলোর আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ বাংলাদেশ জাপানি গাড়ির বড় বাজার। কম দামে এসব গাড়ি বাংলাদেশে পাওয়া যেতে পারে বলেও জানান মোস্তফা আবিদ খান।

বাণিজ্য প্রবাহ: আমদানি কমেছে, বেড়েছে রপ্তানি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপান থেকে ১.৮১ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন পণ্য আমদানি করেছিল। তার আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ২.০২ বিলিয়ন ডলার। জাপান থেকে লোহা ও ইস্পাত, বিভিন্ন ধরনের গাড়ি, শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বোর্ড, চশমা, ফটোগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফির যন্ত্রপাতি বেশি আমদানি হয়।

অন্যদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা ১৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার বা ১.১২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিলেন। তার আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা বা ১.০৩ বিলিয়ন ডলার। জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই আসে পোশাক খাত থেকে। এর বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি পণ্য, পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে।

(জাপানে রপ্তানির তথ্যটি বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার অংকে প্রকাশ করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত রপ্তানির পরিমাণকে বর্তমান বিনিময় হারে ডলারে রূপান্তর করা হয়েছে।)

রপ্তানিকারকরা স্বাগত জানালেন, দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান

বিজিএমইএ’র সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক বাবলু টিবিএসকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই অগ্রাধিকারমূলক (পিটিএ) ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে। জাপানের সঙ্গে যে ইপিএ হলো সেটি হচ্ছে পিটিএ বা এফটিএর আগের পার্ট। এটি অবশ্যই বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য সুখবর।

তিনি বলেন, “জাপান ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং এই বাজারে সম্ভাবনা রয়েছে। এইচএন্ডএম, গ্যাপসহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের পণ্য জাপানে যায়। জাপানের ক্রেতাদের পেমেন্ট খুব ভালো। তারা পণ্যের কোয়ালিটি নিয়ে আপোষ করেন না। যে রপ্তানিকারক জাপানের মানদণ্ড অনুযায়ী রপ্তানি করতে পারেন তিনি বিশ্বের সব দেশের জন্যেই উপযুক্ত।”

জেনিস সুজ এর চেয়ারম্যান এবং লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানু্ফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নাসির খান টিবিএসকে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার পরে এ ধরনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ছাড়া বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা যাবে না। কারণ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ কঠিন হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করেছে সেটিও নতুন চ্যালেঞ্জ। ফলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে বাংলাদেশের জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি এখন বাস্তবতা। সেই প্রেক্ষিতে জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য ইতিবাচক।

তবে তিনি বলেন, চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে রপ্তানি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। জাপান ইপিএ বাস্তবায়নে যেন একই ধরনের বিলম্ব না হয়—সে প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

বিনিয়োগ বাড়ার প্রত্যাশা

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, এ ধরনের অর্থনৈতিক চুক্তি আমরা আগে কখনো করিনি, যে কারণে এ ক্ষেত্রে কী করতে হয়, সেটাও আমাদের সেভাবে জানা ছিল না। এই সরকারের সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা সেটা পেরেছি। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশের জন্য ভালো চুক্তি।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এটা বিশ্বের অন্য দেশে জাপানের বিনিয়োগের তুলনায় খুব অল্প।

তিনি বলেন, “আগে যখন আমরা জাপানের কাছে অধিক বিনিয়োগ চেয়েছি, তখন এ ধরনের (অর্থনৈতিক চুক্তি) কোন স্ট্রাকচার ছিল না বলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতো। আগে এ দেশে জাপানের বিনিয়োগ দু-একটা ক্ষেত্রে ছিল, এখন অনেক খাতে সেটা বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে লজিস্টিক, ইলেকট্রনিক্স, আইটি ও  অটোমোবাইল খাতে বড় বিনিয়োগ আসবে। এর ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর আরও ত্বরান্বিত হবে।”

তিনি বলেন, আমাদের সব সময় ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু ভিয়েতনামের ৩০ দেশের সঙ্গে ট্রেড এগ্রিমেন্ট আছে। আমরা মাত্র শুরু করছি। তবে যে যাত্রা শুরু হলো, আগামী সময়ে আরও অনেক অর্থনৈতিক চুক্তি করতে পারব। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের জন্য সহজ হবে।

সেবা খাতে বাজার উন্মুক্তকরণ

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি সেবা উপখাত উন্মুক্ত করবে, আর জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি উপখাত উন্মুক্ত করবে—চারটি সরবরাহ পদ্ধতিতে। এতে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালের আগষ্টে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) বাংলাদেশে বিনিয়োগ রয়েছে এমন জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একটি সমীক্ষা করে। বাংলাদেশে ওই সময় পর্যন্ত ২১৪টি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

ওই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭২ শতাংশ জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানায় জেট্রোকে। ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলো উল্লেখ করে, এ দেশে ব্যবসার খরচ এখনো কম। বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন খরচও কম। জাপানে যে পণ্য উৎপাদনে ১০০ ডলার খরচ হয়, সেখানে বাংলাদেশে সেই পণ্য উৎপাদনে খরচ ৬০ শতাংশ কম। ফলে ইপিএ হওয়ার ফলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

ইপিএ’র আলোচক পর্যায়ে দরকষাকষি শেষ হয়েছে। এখন আইনি পর্যালোচনা (লিগ্যাল স্ক্রাবিং) ও চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হবে।

এম এম