উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান আসাঞ্জ সুইডেনে নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়াকে তিনি তহবিলের চরম অপব্যবহার এবং সুইডিশ আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধে সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, অভিযোগপত্রে আসাঞ্জ দাবি করেন—মাচাদোকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া প্রায় এক কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার) যেন বিতরণ না করা হয়, সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বুধবার দাখিল করা এই মামলায় নোবেল ফাউন্ডেশনের শীর্ষ নেতৃত্বসহ মোট ৩০ জনকে তহবিল অপব্যবহার, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা এবং আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগানের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে গত অক্টোবরে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য নোবেল কমিটি মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। তবে আসাঞ্জের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত নোবেল শান্তি পুরস্কারকে শান্তির প্রতীক থেকে যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়ার উপকরণে পরিণত করেছে।
আসাঞ্জ বলেন, মাচাদো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপকে সমর্থন করছেন, যার লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এটি নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালের উইলে উল্লিখিত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ওই উইলে শান্তি পুরস্কার এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যারা জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও মানবকল্যাণে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে।
মাচাদোর নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রতি তার সমর্থন তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। পুরস্কার ঘোষণার পর তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে সমর্থন জানান এবং ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের অঙ্গীকার করেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা-বিরোধী কঠোর নীতির প্রতিও মাচাদো সমর্থন প্রকাশ করেন। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে, মাদুরো সরকার মাদকচক্রের সঙ্গে জড়িত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি—যদিও এই অভিযোগ নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা ও লাতিন আমেরিকার উপকূলে কথিত মাদকচক্রের লক্ষ্যবস্তুতে ২০টির বেশি সামরিক হামলার অনুমোদন দেন, যাতে এ পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন নিহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান বাহিনীর বড় আকারের মোতায়েন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। আসাঞ্জের মতে, মাচাদোর এই সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান শান্তি পুরস্কারের নীতিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। তিনি সতর্ক করে বলেন, নোবেল তহবিল যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার বাস্তব ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও শান্তি পুরস্কার নরওয়েতে ঘোষণা করা হয়, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের দায় স্টকহোমভিত্তিক নোবেল ফাউন্ডেশনের ওপরই বর্তায় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, জুলিয়ান আসাঞ্জ ২০০৬ সালে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১০ সালে মার্কিন সেনা গোয়েন্দা বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিংয়ের ফাঁস করা গোপন নথি প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। পরবর্তীতে প্রত্যর্পণ এড়াতে ২০১২ সালে তিনি লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং সেখানে সাত বছর অবস্থান করেন। ২০১৯ সালে তাকে যুক্তরাজ্যের বেলমার্শ উচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তার বিচার চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে মার্কিন বিচার বিভাগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে গুপ্তচরবৃত্তি আইনের একটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করে তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান।
সূত্র: আল-জাজিরা










