বিতর্ক থেকে বক্স অফিস—২০২৫ সালে হলিউডের যে ১০ সিনেমা আলোচনায়

প্রতিবছরের মতোই হলিউড সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে আরও একটি বছর পার করেছে। বিদায়ী ২০২৫ সালও নানা চড়াই-উতরাইয়ের কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বছরজুড়ে বিভিন্ন কারণে আলোচনায় ছিল বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গন। চলতি বছরের শুরুতেই সিনেমাপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুক্তি পায় বেশ কিছু প্রতীক্ষিত ছবি। সেগুলো শুধু সিনেমার পর্দাই কাঁপায়নি, আন্দোলিত করেছে বিশ্বের কোটি কোটি চলচ্চিত্রপ্রেমীকেও। আইএমডিবির রেটিং, জনপ্রিয়তা ও বক্স অফিস সাফল্যের বিচারে ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া সেরা ১০টি সিনেমা নিয়েই এ আয়োজন। 

চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়া ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার মুক্তির পরপরই সিনেমা অঙ্গনে তুমুল আলোড়ন তোলে। ছবিটির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, এটি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিতর্ক ও বিভাজন সৃষ্টি করে। অতীতের ঘটনাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখালেও তীব্র বামপন্থি রাজনৈতিক ধারার প্রতি সমর্থন স্পষ্ট এই সিনেমায়। পল থমাস অ্যান্ডারসনের পরিচালনায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, পারিবারিক টানাপড়েন ও দ্রুতগতির অ্যাকশন একসঙ্গে মিলেছে। লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর প্রাণবন্ত উপস্থিতির সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছবিটিকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মুক্তির অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সেরা ছবির তালিকায় জায়গা করে নেয়।

সিনার্স—অর্থাৎ পাপীরা—রায়ান কুগলারের পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মিত একটি ব্যতিক্রমধর্মী চলচ্চিত্র। এতে মাইকেল বি জর্ডান অভিনয় করেছেন যমজ দুই ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রে। ১৯৩২ সালের মিসিসিপিকে পটভূমি করে নির্মিত এই ছবি একদিকে যেমন যুগান্তকারী ভ্যাম্পায়ার ফিল্ম, অন্যদিকে তেমনি বর্ণবাদ, পরিবার, কুসংস্কার ও ব্লুজ সংগীতের গভীর আখ্যান। চলতি বছরের অন্যতম আলোচিত এই হরর সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবেও বড় সাফল্য পেয়েছে। ১০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবিটি বক্স অফিস থেকে আয় করেছে ৩৬৭ মিলিয়ন ডলার।

৮ আগস্ট মুক্তির পর সুপারন্যাচারাল হরর সিনেমা ওয়েপনস দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জ্যাক ক্রেগারের পরিচালনায় সাইকোলজিক্যাল হরর ও ডার্ক কমেডির মিশেলে নির্মিত এই ছবি এক রাতেই ১৭টি শিশুর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দিয়ে শুরু হয়। কোথায় গেল তারা, কেনই বা গেল—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে কাহিনি। শিশুদের শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক ও পুলিশের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয় রহস্য। নীরবতা, শিউরে ওঠা ভয়, রক্তাক্ত দৃশ্য ও অদ্ভুত হাস্যরসের মিশ্রণে ছবিটি হয়ে উঠেছে অনন্য এক হরর অভিজ্ঞতা।

দক্ষিণ কোরিয়ান ব্যঙ্গাত্মক ব্ল্যাক কমেডি থ্রিলার নো আদার চয়েস পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন পার্ক চ্যান-উক। ডোনাল্ড ওয়েস্টলেকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন লি বিয়ুং-হান। গল্পে দেখা যায়, এক সুখী কাগজ-কারখানার ম্যানেজার হঠাৎ চাকরি হারিয়ে অন্য কোথাও কাজ না পেয়ে ধীরে ধীরে হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যান এবং খুনের পথে হাঁটেন। একই সঙ্গে সিনেমাটি ব্যাপক ছাঁটাই ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে সময়োপযোগী প্রশ্ন তোলে। ছবিটি মুক্তি পায় গত সেপ্টেম্বরে।

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডকে পটভূমি করে নির্মিত ব্রিং হার ব্যাক শুরু হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পাইপার ও তার বড় ভাই অ্যান্ডির মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা দিয়ে। বাসায় ফিরে তারা দেখে, খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে বাথরুমে মারা পড়ে আছেন তাদের বাবা। এতিম হয়ে পড়া এই দুই ভাই-বোন আশ্রয় নেয় পালক মা লরার কাছে, যিনি একজন অভিজ্ঞ শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মী। লরার নির্জন বাড়িতে তার দত্তক সন্তান অলিভারের নিঃশব্দ দৃষ্টি, সাদা চোখ ও অস্বস্তিকর উপস্থিতি ধীরে ধীরে ভয়ের আবহ তৈরি করে। নানা অঘটনের মধ্য দিয়ে রহস্য উন্মোচনের এই গল্পে বাজিমাত করেন অস্ট্রেলিয়ার যমজ পরিচালক ড্যানি ও মাইকেল।

শেক্সপিয়ারের পুত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত ঐতিহাসিক ড্রামা হামনেট দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ১৬শ শতকের ইংল্যান্ডে। ক্লোয়ে ঝাও পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে শোক, ভালোবাসা ও পারিবারিক টানাপড়েনের আবেগঘন গল্প ফুটে উঠেছে। শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত ট্র্যাজেডি হ্যামলেট-এর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করা এই ছবি দৃশ্য নির্মাণ ও অভিনয়ের কারণে ২০২৫ সালের অন্যতম আবেগপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। ছবিটি মুক্তি পায় গত নভেম্বরে।

আধুনিক যুগে অর্থ ও ভালোবাসার সম্পর্ককে নতুনভাবে তুলে ধরেছে সেলিন সংয়ের ম্যাটেরিয়ালিস্টস। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থের প্রভাব নিয়ে বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও প্রেমের প্রতি নির্মাতার কুণ্ঠা নেই—তারই প্রতিফলন এই সিনেমা। ডাকোটা জনসন অভিনয় করেছেন একজন পেশাদার ম্যাচমেকারের চরিত্রে, যিনি নিজের জীবনে দুই পুরুষের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। একদিকে সংগ্রামী অভিনেতা হিসেবে ক্রিস ইভানস, অন্যদিকে ধনকুবের চরিত্রে পেদ্রো প্যাসকল। সিনেমাটি দর্শক ও সমালোচক—দুই পক্ষের কাছেই ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।

স্পাইক লি পরিচালিত হায়েস্ট টু লোয়েস্ট থ্রিলারে ডেনজেল ওয়াশিংটন ও জেফরি রাইটের অভিনয় ছবিটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আকিরা কুরোসাওয়ার হাই অ্যান্ড লো থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সিনেমাজুড়ে স্পাইক লির স্বকীয় ছাপ স্পষ্ট। একজন সংগীত ব্যবসায়ীর ছেলেকে অপহরণ ঘিরে কাহিনি আবর্তিত হলেও এর ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে বর্ণ, শ্রেণি ও নৈতিক দ্বন্দ্বের জটিল বাস্তবতা। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা এক ব্যক্তি কি অন্যের সন্তানের জন্য মুক্তিপণ দেবে—এই নৈতিক প্রশ্নের গভীরতাই সিনেমার মূল শক্তি।

ব্র্যাডলি কুপার পরিচালিত ইজ দিস থিং অন? ২০২৫ সালের অন্যতম সেরা আমেরিকান কমেডি-ড্রামা হিসেবে বিবেচিত। একজন ফিন্যানশিয়াল অফিসার হঠাৎ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে পা রাখেন—আর সেখান থেকেই বদলে যায় তার জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি। দাম্পত্য সংকট, মধ্যবয়সের হতাশা ও জীবনের অনিশ্চয়তা হাস্যরসের আড়ালে গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে। গত ১০ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পরই এটি প্রশংসা কুড়ায়, যদিও বড় পর্দায় মুক্তি পাবে ১৯ ডিসেম্বর।

বছরের শুরুতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্সের কম্প্যানিয়ন মুক্তির পর দর্শকমহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। ছবিটি প্রথমে স্বপ্ন দেখালেও ধীরে ধীরে নিয়ে যায় দুঃস্বপ্নের ভেতর। আইরিস ও জশ নামের এক দম্পতি বন্ধুদের সঙ্গে নির্জন কেবিনে ছুটি কাটাতে গিয়ে আবিষ্কার করে, তাদের সম্পর্কের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক বড় ‘টেকনিক্যাল’ ত্রুটি। ড্রু হ্যানককের পরিচালনায় এটি একই সঙ্গে সায়েন্স ফিকশন, কমেডি ও থ্রিলারের মিশেল। টেক-স্যাটায়ার হিসেবে প্রশংসিত এই ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সোফি থ্যাকচার।

বিথী/