বিডার সংলাপে সুদ কমানো ও ‘কর–সন্ত্রাস’ বন্ধের দাবি ব্যবসায়ীদের

Bangladesh Investment Development Authority

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিনিয়োগ নিয়ে বিডা আয়োজিত অংশীজন সংলাপে অংশ নেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও শিল্পোদ্যোক্তারা। এ সময় তাঁরা তাঁদের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

ব্যাংক খাতে ঋণের সুদহার এখন প্রায় ১৫ শতাংশ। এত সুদহার দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অসম্ভব। এ ছাড়া লাভ হোক কিংবা লোকসান, ব্যবসায়ীদের জন্য অগ্রিম আয়কর বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই। এ ছাড়া এক বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে নতুন বিনিয়োগে সাহস করছেন না কেউ।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংলাপে সরকারের এক উপদেষ্টাসহ শীর্ষ পাঁচ ব্যক্তির সামনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা। ‘স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে বিনিয়োগ সংলাপ’ শিরোনামে এ সংলাপ যৌথভাবে আয়োজন করে বিডা ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)।

ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান প্রমুখ।

সংলাপের শুরুতেই গত এক বছরে বিডার বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এরপর শুরু হয় প্রশ্নোত্তর পর্ব। ব্যবসায়ীরা একে একে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, তুলে ধরেন নানা অভিযোগ। এসব প্রশ্ন ও অভিযোগের উত্তর দেন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যবসায়ীদের চেয়ে আমলারা দেশ থেকে বেশি অর্থ পাচার করেছে বলে মনে করেন সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে শুধু ব্যবসায়ীরা বিত্তবান হয়েছেন, নাকি আমলারাও হয়েছেন—এই কথাটা বলা হয় না। যে টাকা পাচার করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার করেছেন আমলারা। আমরা ব্যবসায়ীরা এ দায় নিতে চাই না। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা টাকা চুরি করেন, গ্যাস চুরি করেন, তাঁদের ধরেন, আইনের আওতায় আনেন। ওনাদের দায় যেন আমাদের ওপরে না আসে।’

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা (রিফান্ড) না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান লোকসান করলেও তাদের উচ্চ টিডিএস ও এআইটি দিতে হয়। এটি একটি বড় সমস্যা। ন্যায়সংগত ও কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন।

ওয়ালটনের এমডি এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীর চেয়ে সংযোজনকারী বেশি সুবিধা পান। এতে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমদানিকারক ও উৎপাদকদের কর হারে অন্তত ১০ শতাংশ পার্থক্য থাকা উচিত। আগামী বাজেটে আমরা বিষয়টি ঠিক করব।’

‘এই সুদহার আর সইতে পারছি না’

গভর্নরের উদ্দেশে নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আপনার কাছে একটা বিনীত নিবেদন, ব্যবসায়ীরা এই সুদহার আর সইতে পারছেন না। ব্যবসার খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছি।’

জবাবে গভর্নর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ বা এর নিচে নামলেই আমরা সুদহার কমাব। কারণ, মূল্যস্ফীতি কমাতে না পারলে মুদ্রার বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা আসবে না। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে, অন্যদিকে কম সুদহার থাকবে—এটি উচ্চাশা। এটা হতে পারে না। আমরা আশা করছি, চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। তখন সুদহার একক অঙ্কে নেমে আসতে পারে।’

প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে খুবই ভীত অবস্থায় রয়েছি। এ জন্য আমরা কোনো বিনিয়োগ প্রকল্প নিতে পারছি না।’

বিদ্যুৎ–জ্বালানি নিয়ে দুর্ভোগ

এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কুমিল্লায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে আমি ২০১৫ সালে বিনিয়োগ করেছি। এ জন্য বিদেশি সংস্থা থেকে ঋণ করতে হয়েছে। সেখানে গ্যাস–সংযোগের জন্য নিজ টাকায় জমিও কিনে দিয়েছি। কিন্তু এখনো গ্যাস–সংযোগ না পাওয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু করতে পারিনি। তিন বছর ধরে প্রচুর সুদ দিতে হচ্ছে।’

টিকে গ্রুপের গ্রুপ পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের জন্য সম্প্রতি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি (এমপিপি) করা হয়েছে। কিন্তু এ নীতিতে হুইলিং চার্জ (প্রক্রিয়াগত মাশুল) বিষয়ে স্পষ্ট করা নেই।

বেসরকারি খাতে এলএনজি আমদানির অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা জ্বালানি। আমদানির সুযোগ বাড়ালে জ্বালানি খাতের অনেক সমস্যা কমে আসবে।’

জ্বালানি উপদেষ্টা যা বললেন

জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণের জন্য এমপিপি করা হয়েছে। জ্বালানি খাতেও বেসরকারি অংশগ্রহণে নীতিমালা করা হচ্ছে। সরকারি গ্যাস কোম্পানিগুলোর ক্ষমতার অপব্যবহার কমাতে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, একবার গ্যাস–সংযোগ দেওয়ার পর বারবার যেন তিতাসের দপ্তরে আসতে না হয়, সেই কাজ করা হচ্ছে। যানজট নিরসনে রেল ও নদীপথে ২০ শতাংশ পরিবহনের পরামর্শ দেন জ্বালানি উপদেষ্টা।

সংলাপে ব্যবসায়ীরা আরও কিছু দাবির কথা জানান। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিতে ইডিএফ তহবিল পুনরায় চালু করা, ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধান করা, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে সরকারকে একটা স্পষ্ট অবস্থান জানানো। ব্যবসায়ীরা বলেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো বিদেশি অংশীদারদের কথা শুনে চলা ব্যবসায়ীরা সমর্থন করেন না।