পুলিশ কমিশনের খসড়ায় আমলাতন্ত্রের ‘হস্তক্ষেপ’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের জোর দাবি ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটি পুলিশ কমিশনের খসড়া তৈরি করে। তবে সেই খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর তা অনেকটাই পাল্টে যায়। বাদ পড়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির খসড়ার বিষয়ে আমলারা আপত্তি তোলেন। আইজিপি (পুলিশের মহাপরিদর্শক) নিয়োগের বিষয়টিসহ কয়েকটি সুপারিশের বিরোধিতা আসে। পুলিশকে আগের মতোই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার মাধ্যমে কার্যত পুলিশ কমিশনকে ‘নখদন্তহীন’ করে রাখার সুপারিশ আসে আমলাদের দিক থেকে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, খসড়ায় এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে যা প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে কার্যত দুর্বল ও ক্ষমতাহীন করে তুলবে।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের কী ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা ১১ নভেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, এই আইন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করার কথা ছিল, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নেওয়ার পর তারা এটি প্রস্তুত করেছে। আইনটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল যে কমিশন আইজিপি নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম প্রস্তাব করবে এবং সরকার সেই তিনজনের মধ্য থেকে একজনকে আইজিপি পদে নিয়োগ দেবে। যখন এই আইনটি আন্তমন্ত্রণালয় কমিটিতে পাঠানো হয়, তখন আমলাতন্ত্র প্রচণ্ডভাবে আইনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায়।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর খসড়া উত্থাপিত হয়েছিল। তবে অধ্যাদেশটি অনুমোদন করা হয়নি। এই অধ্যাদেশ আরও বিস্তারিতভাবে এবং সংশোধিত আকারে উপদেষ্টা পরিষদের পরবর্তী সভায় উত্থাপন করতে বলা হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভার ঠিক এক দিন আগে গত শুক্রবার বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে পুলিশ কমিশনের সংশোধিত খসড়া পাস না করার দাবি তোলা হয়েছিল। বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনের পূর্বে এই আইনগুলো (পুলিশ কমিশন ও এনজিও–সংক্রান্ত আইন) পাস করার পেছনে সরকারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া তড়িঘড়ি করে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন পাস করা সমীচীন হবে না। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, উপদেষ্টা পরিষদে উত্থাপন করা খসড়ায় নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা পুলিশ কমিশনকে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। অর্থাৎ এগুলো আগের মতোই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করবে। এমনকি আইজিপি নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য কমিশনকে তিন সদস্যের একটি প্যানেল গঠনের যে ক্ষমতার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন কমিটি, সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপদেষ্টা কমিটি একটি ‘সংবিধিবদ্ধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন’ গঠনের কথা বললেও সেটিও খসড়ায় ছিল না।

উপদেষ্টা কমিটির প্রস্তাবে ৯ সদস্যের পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত খসড়ায় সাত সদস্যের পুলিশ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। অবশ্য পুলিশ কমিশনের সদস্য বাছাইয়ের জন্য যে কমিটি করা হবে, তার সভাপতি হবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটি দুটি খসড়াতেই ছিল। যে কারণে বাছাই কমিটি কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে (সদস্য বাছাই), তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এমনকি আইজিপি নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য কমিশনকে তিন সদস্যের একটি প্যানেল গঠনের যে ক্ষমতার দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল আইন উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন কমিটি, সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উপদেষ্টা কমিটি একটি ‘সংবিধিবদ্ধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন’ গঠনের কথা বললেও সেটিও খসড়ায় ছিল না।

পুলিশ কমিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা

পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, উপদেষ্টাদের কমিটির সুপারিশের পরও পুরো প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্বিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় কোনোভাবেই পুলিশের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। এ কারণেই তারা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাদ দিয়ে একটি ‘নখদন্তহীন’ পুলিশ কমিশন গঠন করতে চায়। অর্থাৎ নামে কমিশন থাকবে, কিন্তু কার্যকর ভূমিকা থাকবে না।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ কমিশন নিয়ে যা হচ্ছে, তা খুবই হতাশাজনক। উপদেষ্টাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি পুলিশ কমিশনের খসড়া করল। তারপর সেটিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপরও কোনোভাবেই অচলায়তন ভেঙে কমিশন গঠনের কাজটি আগাচ্ছিল না।

আইজিপি বলেন, ২০০৭ সালেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। তখনো পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিলে সেটি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ১৫ বছর আটকে ছিল। এবার পুলিশকে স্বচ্ছতার ধারায় আনার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ কমিশন গঠন সেই আগের মতোই অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। আবার কোনো ক্ষমতা না দিয়ে এই কমিশন গঠন করা হলে তা কখনোই পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে পারবে না।

উপদেষ্টা কমিটি প্রথম খসড়ায় পুলিশ কমিশনের কার্যক্রমের বেশির ভাগ বিষয় ছিল নির্দেশনা বা সুপারিশকেন্দ্রিক। কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের কাজ হবে নীতিমালা প্রণয়ন করা। যেমন নিয়োগ-পদোন্নতি ও পদায়নের এখতিয়ার কমিশনের না থাকলেও তারা এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেবে বা সুপারিশ করবে। তবে সেই খসড়ায় সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে কিছু বলা ছিল না। সর্বশেষ খসড়ায় সেটিও বাদ দেওয়া হয়েছে।