বনদস্যু দমনে সুন্দরবনে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অভিযান

সুন্দরবনে বনদস্যুতা দমনে চলছে যৌথ বাহিনীর কম্বিং অপারেশন। এ অভিযানে কোস্টগার্ডের সঙ্গে নৌবাহিনী, র‌্যাব, নৌপুলিশ, পুলিশ ও বন বিভাগ অংশ নিয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এ যৌথ অভিযান সুন্দরবন দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।

তবে অভিযান চললেও অপহরণের ১০ দিন পার হলেও এখনো মুক্তি মেলেনি ২০ জেলের। তাদের বর্তমান অবস্থার সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি মহাজন ও পরিবারের সদস্যরা। মহাজনদের দাবি, জিম্মি জেলেদের মুক্তিপণ হিসেবে জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করেছে বনদস্যুরা। দাবি করা অর্থ পরিশোধ না করলে জিম্মিদের করুণ পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এতে চরম উদ্বেগ ও চাপে রয়েছেন মহাজনরা।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে বঙ্গোপসাগরের নারিকেলবাড়িয়া ও আমবাড়িয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে ২০ জেলেকে অপহরণ করে বন ও জলদস্যু সুমন এবং জাহাঙ্গীর বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা। অপহৃত জেলেরা পূর্ব সুন্দরবনের দুবলার চর শুঁটকি পল্লীর আলোরকোল ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা। তাদের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায়।

গত দেড় বছরে অন্তত ২০টি বনদস্যু বাহিনীর উত্থান ঘটেছে বলে জানা গেছে। সুন্দরবন এসব দস্যুদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় জেলে ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে যৌথ অভিযান শুরু হয়।

এর আগে গত রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) খুলনা সার্কিট হাউসে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রশাসনের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযান শুরু হয়।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানান, সুন্দরবনে দস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে নৌবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান চলছে। দস্যু নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

দুবলার চর শুঁটকি পল্লীর মহাজন মোতাসিম ফরাজী, জাকির শেখ, আব্দুর রউফ মেম্বার ও পঙ্কজ বিশ্বাস জানান, দস্যুদের ভয়ে জেলেরা সাগর ও সুন্দরবনে যেতে আতঙ্কিত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখন কেবল দিনের বেলা মাছ ধরছেন তারা। অপহৃত ২০ জেলেকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান শুরু হলেও দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে দস্যুদের আধিপত্য বেড়েছে। বনজীবী ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছেন। তিনি বলেন, ঢাকঢোল পিটিয়ে দস্যু দমন সম্ভব নয়; কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। পূর্বের সফল পদ্ধতিতে অভিযান পরিচালনা করলে ফল মিলতে পারে।

দুবলা ফিশারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুন্দরবন আবারও দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দস্যু নির্মূল করা না গেলে মাছের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ২০ থেকে ২২ জন জেলে দস্যুদের হাতে জিম্মি রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তিনি যৌথ অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, গোপনে ও ছদ্মবেশে অভিযান পরিচালনা করলে তা বেশি কার্যকর হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা হবে।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। জেলে ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

-সাইমুন