ইউরোপ নয় ভারতে গিয়ে বেশি খেলা উচিত: রানী হামিদ

রানী হামিদ, বাংলাদেশের দাবায় এক কিংবদন্তি। ১৯৪৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটে জন্ম নেয়া এ দাবাড়ুবাংলাদেশের প্রথম নারী আন্তর্জাতিক দাবা মাস্টার। ৮২ বছর বয়সেও চুটিয়ে দেশ-বিদেশে দাবা খেলে যাচ্ছেন। তার পুরো নাম সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন। ১৯৮৪ সাল থেকে শুরু করে সমস্ত বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে খেলেছেন। তিনি ৩ বার ব্রিটিশ মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৫ সালে ফিদে নারী আন্তর্জাতিক মাস্টার (ডব্লিউআইএম) উপাধিতে ভূষিত হন। ২০১৭ সালে তিনি দিল্লিতে কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জিতেছেন। পরের বছর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত দাবা বিশ্বকাপ ২০১৮-তে ‘সাংবাদিক চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছেন। গত বছর হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট ৪৫তম বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডের অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে সর্বাধিক ২০টি অলিম্পিয়াডে খেলা একমাত্র দাবাড়ু। ৮২ বছর বয়সে জানুয়ারিতে মহিলা দাবা লিগে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপিকে শিরোপা জেতাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। এ পর্যন্ত ২০ বার জাতীয় দাবায় চ্যাস্পিয়ন হয়েছেন। ফালগুনের এক ভরদুপুরে রানী হামিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, দৈনিক আলোকিত স্বদেশ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার-শামসুজ্জামান শামস

আলোকিত স্বদেশ: জানুয়ারিতে ৮২ বছর বয়সে আনসার ও ভিডিপিকে শিরোপা জিততে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। সামনে কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছেন কি ?
রানী হামিদ : ভারতে খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছি। যাওয়া হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ ভারত সরকার ভিসা দিচ্ছে না। আমাদের দেশে নতুন সরকার এসেছে। নরেন্দ্র মোদী অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখন দেখা যাক তারা আমাদের ভারত যাওয়ার ভিসা দেয় কিনা।
আলোকিত স্বদেশ : ভারত সরকার যদি ভিসা না দেয় তাহলে অন্য কোনো দেশে খেলতে যাবেন কি?
রানী হামিদ: ইউরোপ কিংবা অন্য কোনো দেশে খেলতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। স্পন্সর পাওয়া বেশ কঠিন। ইউরোপে যেতে যে বিমান ভাড়া প্রয়োজন সে টাকা দিয়ে ভারতে দশজন খেলোয়াড় পাঠানো যায়। কয়েক হাজার টাকা হলে ভারতে যাওয়া যায়। ভারতে গেলে বেশ কয়েকটি টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া যায়। কেরালা, মাদ্রাজ ও পশ্চিমবঙ্গ বিভিন্ন শহরে একের পর এক টুর্নামেন্ট হয়। আমি স্পন্সর পেলেও আমার সঙ্গী সাথীদের ভিসা পাওয়া বেশ কঠিন। বয়স হয়েছে তাই একা কোথায় গিয়ে টুর্নামেন্টে অংশ নিতে সাহস পাই না।
আলোকিত স্বদেশ : অনেকে বলেন ইউরোপে বিশেষ করে রাশিয়া, হাঙ্গেরী, গ্রিসে খেললে দাবাড়ুদের উন্নতি দ্রুত ঘটে।
রানী হামিদ: ধারণাটা ভুল। ইউরোপ নয়, ভারত এখন দাবায় এক নম্বর।। ভারতে দাবার জোয়ার চলছে। সারা বছর ভারতে অনেক বড় বড় দাবা টুর্নামেন্ট হয়। আমাদের দেশের দাবাড়ুদের জন্য ইউরোপে যাওয়া অনেক ব্যয়বহুল। তাই আমি মনে করি ভারতে গিয়ে বেশি বেশি টুর্নামেন্ট খেলে ব্যাটিং বাড়ানো উচিত। আমাদের মনন রেজা নীড় ৮ বছর বয়স থেকে ভারতে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলে রেটিং বাড়িয়েছে।
আলোকিত স্বদেশ : আপনি স্পন্সর পেলেও ও অন্যরা পাচ্ছে না এর কারণ কি?
রানী হামিদ: স্মিত হাসি হেসে, আমাকেও স্পন্সর পেতে কষ্ট হয়। আমাদের দেশের স্পন্সররা সাধারণত ফুটবল এবং ক্রিকেটের পিছনে বেশি ঘুরে। দাবা বা অন্য খেলায় তাদের মনোযোগ কম। ব্যক্তিগত ইভেন্টে তারা তেমন আগ্রহ দেখায় না।
আলোকিত স্বদেশ : স্পন্সররা দাবায় আগ্রহী হচ্ছে না কেন?
রানি হামিদ: স্পন্সরাতো তাদের সুযোগ সুবিধার কথাই ভাববে। তারা ফুটবল ক্রিকেটকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে এ কথা সত্য, আমার মনে হয় তাদের সঠিকভাবে গাইড করতে পারলে তারা হয়তো আগ্রহী হতো। ছোট ছোট ফেডারেশন গুলো যেন স্পন্সরের অপেক্ষায় বসে না থাকে সেজন্য সরকারের উচিত ছোট ফেডারেশনগুলোকে আয়ের ব্যবস্থা করে দেয়া।
আলোকিত স্বদেশ : ইদানিং মেয়েরা দাবায় আগ্রহী হচ্ছে না এর কারণ কি?
রানী হামিদ: কিছু মেয়ে এখন ভালো দাবা খেলছে আগামী দুই তিন বছর পর তাদের মেধা বোঝা যাবে। সারা দেশব্যাপী টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে পারলে আরো বেশি খেলোয়াড় পাওয়া যেত। বিশেষ করে সারা দেশে স্কুল দাবাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমি এবং আমার স্বামী (কর্নেল এম এ হামিদ) ৮০ দশকে স্কুল দাবা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। হঠাৎ উনি মারা যাওয়ায় আর এগিয়ে যাওয়া হয়নি। দাবাকে যদি স্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করা যেত তাহলে উন্নতি বেশ ভাল হতো।
আলোকিত স্বদেশ : ফাহাদ রহমান ও মনন রেজা নীড়ের মধ্যে কে আগে গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রানী হামিদ : ফাহাদের বেড লাক বলা যায়। ফাহাদ বেশ ভালো খেলছে। কিন্তু ইদানিং ও স্নায়ু চাপ সামলাতে পারছে না। বেশ কয়েক ম্যাচে হাফ পয়েন্ট পাচ্ছে। নীড় এবং ফাহাদকে ভারতে গিয়ে বেশি বেশি টুর্নামেন্ট খেলা উচিত। ভারত বর্তমানে দাবায় অনেক শক্তিশালী। ভারতে গিয়ে সুবিধে করতে পারে না বলে অনেক দাবাড়ু ভারতে খেলতে চায় না। ভারতে গেলে অনেকগুলো টুর্নামেন্ট খেলা যায়। বেশি বেশি খেলার মধ্য থাকলে ওরা শক্তিশালী হবে। খরচও বেশ কম।
আলোকিত স্বদেশ : অনেকে বলে আমাদের দাবায় উন্নতি হয়নি। পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। পাঁচ আন্তর্জাতিক মাস্টার অনেক দিন ধরে একই অবস্থানে রয়েছে। এর কারণ কি ?
রানী হামিদ : গত ৩০ বছরে আমাদের দাবায় উন্নতি হয়নি বরং অবনতি হয়েছে। এক সময় আমরা ভারতকে অনায়সে হারিয়েছি। কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। উপমহাদেশে ভারতের আগে আমরা গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছি। নিয়াজ মোর্শেদ গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার এক বছর পর বিশ্বনাথন আনন্দ গ্র্যান্ড মাস্টার হয়েছে। ভারতে এখন দাবার জোয়ার চলছে। ওরা অনেক এগিয়েছে। ইন্টারনেটে কয়েক দিন আগে দেখলাম ওদের তিন বছরের এক শিশু দাবায় রেটিং করে ফেলেছে। আমাদের দেশে দাবায় গতি নেই। প্রকৃত সংগঠক নেই। বেনজির আহমেদ আমাদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি মেয়েদের জন্যে কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করেননি। এখন শুনছি তার টাকা পয়সার অভাব নেই। আমাদের দাবাটা রাজধানী কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আমার মতে সারা দেশে দাবা ছড়িয়ে দিতে হবে। বেশি বেশি টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে হবে। মোদ্দা কথা দেশ প্রেমিক সংগঠক নেই।

আলোকিত স্বদেশ : দাবা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারছে না কেন?
রানী হামিদ : বিশ্বকাপে যে শীর্ষে আছে তার সঙ্গে রেটিংয়ে যে নিচে রয়েছে তার খেলা হয়। বিশ্বকাপ যেহেতু নক আউট ভিক্তিক টুর্নামেন্ট তাই হেরে গেলে প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আমাদের যাদের সঙ্গে খেলা হয় তারা আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। রেটিংয়ে যে শীর্ষে তার সঙ্গে ১০০তম অবস্থানে যিনি তার খেলা হয়। ফলে বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারছে না। আমাদের গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হক রাজীব একবার দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠেছিল।
আলোকিত স্বদেশ : সর্বকনিষ্ট আন্তর্জাতিক মাস্টার মনন রেজা নীড় সম্পর্কে কিছু বলুন?
রানী হামিদ: মনন রেজা নীড় বেশ সম্ভাবনাময় দাবাড়ু। আশা করছি ও বেশ দ্রুত গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যাবে। নীড় ৮ বছর বয়স থেকে ভারতের বিভিন্ন টুর্নামেন্ট অংশ নিয়ে রেটিং বাড়িয়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলে দারুণ উন্নতি করেছে। আমাদের অনেক দাবাড়ু ভারতে গিয়ে খেলতে ভয় পায়। কারণ ওখানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে হয়।
আলোকিত স্বদেশ : এমন কোন মজার স্মৃতির কথা বলুন যা মনে পড়লে আপনি একা একা হেসে উঠেন?
রানী হামিদ: সম্ভবত ১৯৮৪ সালের ঘটনা। আমি গ্রিসের দাবা অলিম্পিয়াডে খেলতে গিয়েছিলাম। খেলা শুরুর আগে ভাবলাম এক কাপ চা নিয়ে রুমে প্রবেশ করি। চা হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করতে যাব এমন সময় গার্ড বাধা দিয়ে বলল তুমি মেয়েদের রুমে যাও ছেলেদের রুমে কেন এসেছো? আমি বললাম আমি ছেলেদের দলে কোয়ালিফাইং করেছি। আমি দাবা অলিম্পিয়াডে ছেলেদের দলের খেলোয়াড়। গার্ড আমাকে কিছুতেই রুমে প্রবেশ করতে দেবে না। গ্রিসের ওই গার্ড ইংরেজি বুঝে না। বেশ কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর হঠাৎ একজন এগিয়ে এসে গ্রিস ভাষায় গার্ডকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর আমাকে রুমে প্রবেশ করতে দিয়েছিল।
আলোকিত স্বদেশ : ‘মজার খেলা দাবা’ বইটি লিখতে কে আপনাকে উৎসাহিত করেছিল?
রানী হামিদ: এখন যেমন হাত বাড়ালেই ইন্টারনেটের সাহায্য পাওয়া যায়। ৮০ দশকে ইন্টারনেট ছিল না। দাবা খেলার সময় তা যে লিখতে হয় মফস্বলের অনেক দাবাড়ু তা জানতো না। আমি যখন চারবার জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হলাম। আমার স্বামী এম এ হামিদ বললেন তুমি দাবা নিয়ে বই লেখ। মূলত তার উৎসাহে বইটি লেখা। ওই সময় আমার বইটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল।

-মামুন