বাঙালি জাতির অহংকার, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি)। ১৯৮৪ সালের এই দিনে লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী সিলেটে হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজার সংলগ্ন গোরস্থানে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।
১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করা জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর সামরিক জীবন ছিল নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর অর্জনে সমৃদ্ধ। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা হয় এবং মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৪২ সালে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ ‘মেজর’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) রণাঙ্গনে একটি যান্ত্রিক পরিবহন বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে তিনি অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি সেনা সদরের ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তবে উচ্চপদে কর্মরত থাকলেও তিনি ছিলেন আজন্ম স্বাধীনচেতা; পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবসময় বাঙালির অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন এই মহানায়ক। অবশেষে ১৯৬৭ সালে তিনি কর্নেল পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, যা পরবর্তীকালে তাকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালনে আরও উদ্বুদ্ধ করেছিল।
১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে রাজনীতিতে নাম লেখানো জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী সত্তরের নির্বাচনে এমএনএ নির্বাচিত হয়ে তার জনভিত্তি প্রমাণ করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বঙ্গবন্ধু তাকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বা সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন। রণকৌশল প্রণয়নে তার অসামান্য মেধা আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে আজও গবেষণার বিষয়; বিশেষ করে সীমিত সম্পদ ও লোকবল নিয়ে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা এবং সম্মুখ যুদ্ধের যে অভূতপূর্ব সমন্বয় তিনি করেছিলেন, তা ছিল অবিস্মরণীয়। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কঠোর শৃঙ্খলা এবং ন্যায়পরায়ণতার জন্য তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরবর্তীকালে দেশের রাজনীতিতেও অত্যন্ত সক্রিয় ও নীতিবান ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানী ঢাকাসহ তার জন্মস্থান সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দিবসের শুরুতে আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় ঢাকার রাওয়া হেলমেট হলে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ তার কর্মময় জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। এদিকে সিলেটে তার মাজারে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নেমেছে; বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই মহানায়কের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে দেশের প্রশাসনিক ও সামরিক সংস্কারের যে আলোচনা চলছে, সেখানে জেনারেল ওসমানীর ‘পেশাদারিত্ব’ এবং ‘ব্যক্তিত্ব’ এক বড় অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে সামনে আসছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি কেবল একজন যোদ্ধা নন, বরং দেশপ্রেম ও নৈতিকতার এক সুউচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত।