শরীয়তপুরে ‘আওয়ামী ভোটে’ তিন আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা জয়ী

এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর জেলার তিনটি আসনেই বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। শরীয়তপুরের এই জয়কে ‘আওয়ামী ভোট’ বা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সমর্থনে বিজয় হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন এই আসনে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিএনপির পক্ষে ভোট দিতে দেখা গেছে।

স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা জানান, সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত দুই মাসে জেলার বিভিন্ন স্তরে আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচ হাজার নেতা–কর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এর বাইরেও অনেকে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে প্রচারের অংশ নিয়েছেন। বিএনপির প্রার্থীদের জয়ের ক্ষেত্রে তাঁদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শরীয়তপুরের ৬টি উপজেলা নিয়ে ৩টি আসন গঠিত। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পান। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুরে একটি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপির সফিকুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এরপর অনুষ্ঠিত ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধারে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ৩টি আসনে বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানতে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। দলটির অন্তত ৫ হাজার নেতা–কর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। একাধিক নেতা দলটিতে যোগ না দিয়ে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে প্রচারে অংশ নেন।

তপুর জেলা আওয়ামী লীগের দুজন এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ১০ জন নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা ও তাঁদের অনুসারীরা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।

শরীয়তপুর–১ আসনে (সদর ও জাজিরা) ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৪৪৯ জন ভোটার। এখানে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির প্রার্থী সাঈদ আহমেদ ৭৭ হাজার ৩৯৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ৬২ হাজার ৭১৭ ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের খেলাফত মজলিসের সদস্যসচিব জালালুদ্দীন আহমদ। এ আসনে ৪৩ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে।

শরীয়তপুর–২ (নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার একাংশ) আসনে ৪ লাখ ১৫ হাজার ১৩৪ জন ভোটার। ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির সফিকুর রহমান ১ লাখ ২৯ হাজার ৮১৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাহমুদ হোসেন পেয়েছেন ৭০ হাজার ৮৯২ ভোট। ভোট পড়েছে ৫২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

শরীয়তপুর–৩ (ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার একাংশ) আসনে ভোটার ৩ লাখ ৪০ হাজার ১৩৮ জন। চারজন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ (অপু) ১ লাখ ৭ হাজার ৫১৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। আর জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আজাহারুল ইসলাম পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৬৮৪ ভোট। এখানে ভোট পড়েছে ৫৭ শতাংশ।

শরীয়তপুর–১ আসনে জয়ী জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিজয় পেয়েছি। সকল দলের ও মতের মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছেন। ৩৫ বছর পরে জনগণ ভোট দিয়ে আসনটি বিএনপিকে উপহার দিয়েছেন।’

শরীয়তপুর–২ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত সময়ের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতারা ষড়যন্ত্র করে আমাদের ফলাফল ছিনিয়ে নিয়েছেন। তাঁরা নির্বাচনে ও রাজনীতিতে নেই। তাঁদের অনেকে আমাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছেন। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়েছেন।’

-মামুন