হাসান মাহমুদ রিপন
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অপেক্ষার অবসান, ভোটের মাঠে বাংলাদেশ। ভোটাধিকারবঞ্চিত কোটি মানুষের দীর্ঘ আক্ষেপ ঘুচিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট’। দুটি জেলায় ককটেল বিস্ফোরণসহ বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোট ছিল শান্তিপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে কিছু অভিযোগ এসেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (রাত ৯টা) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ২৪টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১২টি ও এনসিপি একটি আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় ভোটগণনা।
নামজমুন্নাহার হীরা নামের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) এক কর্মী বলেন, ভোর থেকেই এখানে আছি। ভোটারদের ডেকে আনা, ভোটার নম্বর ও কেন্দ্র খুঁজে দিতে ব্যস্ত ছিলাম। এখন ভোট শেষ, তাই একটু আড্ডা দিচ্ছি। ভোটগণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবো। ভালো ফল নিয়েই ঘরে ফিরতে চাই।
তিনি বলেন, ভোট গণনা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরেই অবস্থান করবো। ফলাফল যাই হোক, সেটি জানার পরই কেন্দ্র ছাড়বো।
জামায়াতে ইসলামীর কর্মী আব্দুল আলিম বলেন, গতরাত (বুধবার) থেকেই এখানে আছি। ফলাফল নিয়েই বের হবো। ফলাফল যাই আসুক, শান্তিপূর্ণভাবে মেনে নেবো।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দেড় বছর পর একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গতকাল ভোট দিলেন দেশের ভোটারেরা।
উল্লেখ্য, যেসব কেন্দ্রে বিকেল ৪টার মধ্যে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানে তাদের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করে পরে গণনা শুরু হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। টানা ৯ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলে। তবে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোটগ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছে। সেখানে পরবর্তী সময়ে নতুন তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
একইসঙ্গে ভোটারেরা গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট দিয়ে নিজেদের মত জানালেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন হবে।
সর্বোচ্চ ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হবে জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলনে, আগামী ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠন করা হবে।
আসিফ নজরুল বলেন, ১৭ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই, অর্থাৎ রমজানের আগেই নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। ফলাফলের গেজেট নোটিফিকেশনের পর যত দ্রুত সম্ভব সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর নতুন সরকার শপথগ্রহণ করবে।
ইসি সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণ শেষে গণনার সময় প্রথমে সংসদ নির্বাচনের ব্যালট ও গণভোটের ব্যালট আলাদা করা হবে। এরপর আলাদা দলে ভাগ হয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগণনা করবেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার একে হাজার ২৩২ জন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছে বিপুলসংখ্যক বাহিনী সদস্য। রাজধানীতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হাজারো সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী সদস্যরা মাঠে ছিলেন। এছাড়া নির্বাচনি অপরাধ দমনে বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করেছেন।
এবার ভোট পরিচালনায় সাত লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার ৪২ হাজার ৭৭৯, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ এবং পোলিং অফিসার চার লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন।
নির্বাচনে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই বিভাগীয় কমিশনার, ৬৪ জেলা প্রশাসক এবং তিনজন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা দায়িত্বে রয়েছেন। ২৯৯ আসনের ভোটে মোট ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী সংখ্যা দুই হাজার ২৮ জন। দলীয় প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৩ জন। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন, যার মধ্যে ৬৩ জন দলীয় এবং ২০ জন স্বতন্ত্র। পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৯৪৬ জন, এর মধ্যে এক হাজার ৬৯২ জন দলীয় এবং ২৫৩ জন স্বতন্ত্র।
নির্বাচন সম্পন্নে কোনো সমস্যা হয়নি জানিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, দুপুর পর্যন্ত ভোটের ফ্লো কম ছিল, এরপর ফ্লো বাড়ে।
এবারে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জনসহ কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। এছাড়া আল-জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করেছেন।
এদিকে, ভোটে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। এরমধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য এক লাখ তিন হাজার, নৌবাহিনীর উপকূলীয় পাঁচ জেলায় ১৭ আসনে ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর সাড়ে ৩ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন, কোস্টগার্ড ৩ হাজার ৫৮৫ জন, পুলিশ ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন, র্যাব ৯ হাজার ৩৪৯ জন, আনসার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন এবং বিএনসিসি ১ হাজার ৯২২ জন সদস্য দিয়ে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরুর পর এবারই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ মোট ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোট প্রার্থী সংখ্যা দুই হাজার ২৯ জন; এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন। এবার ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সারাদিন কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকাল থেকেই নারী-পুরুষ ও প্রবীণ ভোটারদের ছিল দীর্ঘ সারি। এছাড়া এবারের ভোটে সারা দেশে নারীর ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটাররা বলেছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে তারা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন। এবার ভোট দিতে কোনো বাধা ছিল না। এবারের পরিবেশে ভয় ছিল না, শান্তিতেই ভোট দিয়েছি।
নির্বাচনের দিনটিতে সারা দেশে বিরাজ করেছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। কোথাও কোথাও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর এলেও সামগ্রিকভাবে দিনটি কেটেছে শান্তিপূর্ণভাবে।
বিএনপি জয়ী হলে জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা আছে কি-না জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, যাদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, কম-বেশি সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে চাই।
অন্যদিকে, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতি এই ভোটের অপেক্ষায় ছিল, বিশেষ করে যুবসমাজ। এই ভোটের মাধ্যমে দেশে এমন সরকার গঠিত হোক, যে সরকার কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের হবে না। বরং যে সরকার হবে ১৮ কোটি মানুষের। আমরা সেই সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী।
বিভিন্ন জরিপে বিএনপির দিকে জয়ের পাল্লা ভারী বলা হলেও এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত কিংবা আজ শুক্রবার ফলাফল ঘোষণার পরই পরিষ্কার হবে ‘জেন-জি’দের স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে কারা চালকের আসনে বসবেন।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় জাল ভোট প্রদান, কেন্দ্র দখল ও কারচুপির অভিযোগ এনে তিনটি সংসদীয় আসনের কয়েকটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় ভোট নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যজোট। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকে প্রায় ১০ সদস্যের এই প্রতিনিধি দল ইসিতে আসে। প্রতিনিধিদলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমসহ জোটের অন্যান্য শরিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ছাড়াও আরও তিনজন নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন।










