ইউক্রেনে তীব্র শীতের মধ্যে রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শীতজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জন “হোয়াইট ডেথ” বা হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছেন। খবর আলজাজিরার।
১৬তম জন্মদিনের পরদিন রাতে পূর্ব কিয়েভে নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে রুশ ড্রোন হামলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন কিশোরী তাইরা স্লুইসারেঙ্কো। তিনি বলেন, “বাথরুমের মেঝেতে বসে ছিলাম, হঠাৎ বিস্ফোরণে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে।” বিস্ফোরণে ভবনের উপরের তলার জানালা ও বাইরের দেয়াল ভেঙে পড়ে। প্রথম হামলার ৩০ মিনিট পর একই এলাকায় দ্বিতীয় ড্রোন হামলা চালায় রাশিয়া-যা ‘ডাবল-ট্যাপ’ কৌশল হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিস্ফোরণে নিহত হন ৫৬ বছর বয়সী জরুরি চিকিৎসাকর্মী সেরহি স্মোলিয়াক, আহত হন তার সহকর্মীরা। সেদিন রাতে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর ২৪২টি ড্রোন ও ৩৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার মধ্যে ছিল ‘ওরেশনিক’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একে “উল্কাপিণ্ডের মতো” বলে উল্লেখ করেছেন। ঘণ্টায় প্রায় ১৩ হাজার কিলোমিটার গতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিক পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব।
এই হামলায় চারজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। একই সঙ্গে ধ্বংস হয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। ২০২২ সাল থেকে এ ধরনের হামলায় ইউক্রেনজুড়ে লাখো মানুষ তাপ, বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে মাইনাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে, বরফে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তা ও দিনিপ্রো নদী। তাইরা স্লুইসারেঙ্কোর অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি আধুনিক ও সৌরবিদ্যুৎ সুবিধাসম্পন্ন হলেও হামলার পর সেটিও উষ্ণতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। তিনি জানান, এখন তাকে চার জোড়া মোজা, টাইটস ও দুটি কম্বলের নিচে ঘুমাতে হচ্ছে।
সাদা মৃত্যু
দেশের টেরনোপিল ও রিভনে অঞ্চলে অন্তত ১০ জন হাইপোথার্মিয়ায় মারা গেছেন বলে জানিয়েছে জরুরি ও স্বাস্থ্য বিভাগ। যুদ্ধের আগে এই দুই অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২১ লাখ। তবে সারা দেশে মোট শীতজনিত মৃত্যুর পূর্ণ পরিসংখ্যান শীত শেষে প্রকাশ করা হয়। প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে এবং আরও প্রায় ৬০ লাখ মানুষ রাশিয়া-অধিকৃত এলাকায় বসবাস করছে -এই হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউনিসেফ সতর্ক করেছে যে শিশু ও নবজাতকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির ইউক্রেন প্রতিনিধি মুনির মাম্মাদজাদে বলেন, “নবজাতকেরা খুব দ্রুত শরীরের তাপ হারায়। পর্যাপ্ত উষ্ণতা ও চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।”
বিদ্যুৎহীন জীবন
রাশিয়ার এই ‘শীতের যুদ্ধ’ শুধু হাইপোথার্মিয়া নয়, কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু ঘটিয়েছে। কাঠ ও কয়লা জ্বালিয়ে ঘর গরম করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি বেড়েছে নিউমোনিয়া, ফ্রস্টবাইট, হৃদরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও। উত্তর কিয়েভের ত্রোইশচিনা এলাকায় বসবাসকারী ইয়েলেনা হোদারেঙ্কো বলেন, “বিদ্যুৎ ছাড়া আমরা যেন কফিনে বাস করছি।” জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে তার ভবনে কোনো কেন্দ্রীয় তাপ নেই। দিনে মাত্র এক–দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসে, তাও অনিয়মিত।
তার অসুস্থ স্বামীর পা গরম রাখতে তিনি গরম পানির বোতল কম্বলের নিচে রাখেন। আশপাশের বহু মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ায় এলাকাটি প্রায় জনশূন্য। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ৬ লাখ মানুষ শহর ছেড়েছেন। যাদের বিকল্প আছে, তাদের শহর ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মানবিক সহায়তা
কিছু সামরিক ইউনিট বেসামরিকদের জন্য কাঠের চুলাসহ তাঁবু স্থাপন করেছে। সেখানে মানুষ গরম খাবার, চার্জিং সুবিধা ও সাময়িক আশ্রয় পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশেষ মেডিকেল ব্যাটালিয়নের এক চিকিৎসাকর্মী বলেন, “আমরা মানুষকে উষ্ণ রাখার জন্য যা সম্ভব সব করছি।” তার দল বিনামূল্যে খাবার বিতরণের জন্য বড় কড়াইয়ে রান্না করছে। ইউক্রেনের শীতের এই দুর্দশা আরও একবার প্রমাণ করছে-যুদ্ধ শুধু বোমা ও গুলির নয়, এটি ঠান্ডা, অন্ধকার ও ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক নির্মম লড়াই।
-বেলাল হোসেন










