পোড়া মাংসের তীব্র গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। কিন্তু উমারু টাংকো যেন তা আর টেরই পাচ্ছেন না। বারবার ফিরে যাচ্ছেন একই জায়গায়-পশ্চিম নাইজেরিয়ার কোয়ারা রাজ্যের ওরো শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি পুড়ে যাওয়া ছোট দোকানে।খবর আলজাজিরার ।
ক্লান্ত টাংকোর চোখ লাল ও ফুলে আছে, কণ্ঠস্বর প্রায় ফিসফিসে। “ওই দোকানের ভেতরে আমার বন্ধুর ছেলে আর নাতির লাশ পড়ে আছে,” বললেন তিনি, চোখের জল সামলাতে গিয়ে। পোড়া দোকানের কালো হয়ে যাওয়া কাঠামোর ভেতরে দেহগুলো শনাক্ত করাই কঠিন। আগুনে পুড়ে চেনার উপায় নেই-দুজন একসঙ্গে গুটিসুটি হয়ে পড়ে আছেন, যেন শেষ মুহূর্তে একে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সশস্ত্র হামলাকারীরা ওরো ও পাশের একটি জনপদে ঢুকে প্রায় ২০০ মানুষকে হত্যা করে। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। পুরো এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীরা আইএসআইএল (আইএস)-সংশ্লিষ্ট একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য। কয়েক দিন আগে তারা শহরে এসে ধর্মীয় প্রচারের অনুমতি চেয়েছিল, যা মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ ওরোর বাসিন্দারা প্রত্যাখ্যান করেন। সেই প্রত্যাখ্যানই হামলার কারণ বলে মনে করছেন তারা।
বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি দোকানের ভেতরে লোকজনকে আটকে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। “ওরা আগুনে পুড়িয়ে দিল… অথচ আমরা তাদের কোনো ক্ষতি করিনি,” কাঁপা গলায় বললেন টাংকো। হামলার তিন দিন পরও ওরোর কেন্দ্রে বিভিন্ন স্থানে আগুনের ধোঁয়া উঠছিল। অসংখ্য ঘর ও দোকান এখন শুধু ধ্বংসাবশেষ। পোড়া টিনের চাল, ছাই হয়ে যাওয়া গৃহস্থালি সামগ্রী ছড়িয়ে আছে রাস্তাজুড়ে—সেই ভয়াল রাতের নীরব সাক্ষী হিসেবে।
প্রায় জনশূন্য শহর
ধ্বংস হওয়া দোকানের বিপরীতে, আরেকটি দোকানের সামনে চুপচাপ বসে ছিলেন পাঁচজন বেঁচে যাওয়া মানুষ। একে একে তারা জানান, কীভাবে প্রাণে বাঁচেন কেউ ঝোপে লুকিয়ে, কেউ অন্ধকারে পালিয়ে, কেউ বেড়ার ফাঁক গলে হামলার শব্দের মধ্যেই। কয়েক মিটার দূরে, খোলা জায়গায় পড়ে ছিল আরেকটি লাশ। গন্ধ অসহনীয় হলেও কারও মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না-যেন শোক অনুভূতিকে অবশ করে দিয়েছে। ছাই ও ধুলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেল তৃষ্ণার্ত কিছু ভেড়া। “এগুলোও শিগগিরই তৃষ্ণায় মারা যাবে,” বললেন হারুনা মোহাম্মদ। এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন ৩৫ বছর বয়সী ইউনুসা, “এখন ভেড়ার কথা কে ভাবছে? আমাদের লাশ দাফন করতে হবে, নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে হবে।” এর মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে ভেসে এলো জুমার আজানের ধ্বনি। যারা রয়ে গেছেন, তারা নামাজের প্রস্তুতি নিলেন। ছোট মসজিদটি আগেও ভিড় সামলাতে পারত না। এখন সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন। উঠান প্রায় ফাঁকা। খুতবায় ইমাম ধৈর্য, সহনশীলতা ও আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণের কথা বলেন। মুসল্লিরা নীরবে শোনেন-প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের সঙ্গে লড়ছেন।
এক কবরে ১২০ জনকে দাফন করেছি
নামাজের পর মসজিদের পাশে একটি গাছের নিচে জড়ো হন বাসিন্দারা। কারা মারা গেছেন, কারা দাফন হয়েছেন, পরের জানাজা কখন-এই হিসাবেই কেটে যায় সময়। কাছেই পাহারায় ছিল সাঁজোয়া যান। সেনা, পুলিশ ও বনরক্ষীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডার। প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু এই ‘নির্বিচার গণহত্যার’ দায়ীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ২২তম ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নিকোলাস রুমে বলেন, “প্রথম লক্ষ্য এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এরপর দায়ীদের খুঁজে বের করে আঘাত হানা হবে।” শহরের উপকণ্ঠের কবরস্থানে প্রতিদিন যান মোহাম্মদ আবদুলকারিম ও তার ভাই। তিনি একটি বড়, নতুন কবর দেখিয়ে বলেন, “এখানে এক কবরে ১২০ জনকে দাফন করেছি। আলাদা করে দাফনের শক্তি বা সামর্থ্য আমাদের নেই।” কিছু দূরে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এখানেই ২৩ জন খ্রিস্টানকেও দাফন করা হয়েছে। কিছু লাশ পাশের গ্রামে নেওয়া হয়েছে।”
নারী ও শিশু অপহরণ
হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি, বাসিন্দারা জানান-ডজন ডজন নারী ও শিশুকে অপহরণ করা হয়েছে। তাদের কোনো খোঁজ নেই, যা শোককে আরও গভীর করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, ওরো সংলগ্ন এলাকা আইএসআইএল, আল-কায়েদা, বোকো হারাম ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। হামলার পর হামলাকারীরা কয়েকবার ওরোতে ফিরে আসার চেষ্টা করে, তবে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের প্রতিহত করে। এরপর তারা বিস্ফোরক ব্যবহার করে অবকাঠামো ধ্বংস করে। আজ ওরো যেন এক ভূতের শহর। একসময় যেখানে ছিল কোলাহল, ব্যবসা ও শিশুদের হাসি-সেখানে এখন নীরবতা। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও, বাসিন্দারা বলছেন-ফিরে আসতে সময় লাগবে। পুনর্গঠন করতে লাগবে আরও অনেক বেশি সময়। ওরো এখন অপেক্ষায়-ছাইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে, শোকে আচ্ছন্ন, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।
-বেলাল হোসেন










