বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অন্তর্র্বর্তী সরকার গত বছরের শেষ দিকে এসে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। গত ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করেছেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পুরোপুরি পৃথক করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এ সংক্রান্ত আইন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ এখনো বহাল আছে। বিশেষ করে, অর্থ বরাদ্দসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকেই যাচ্ছে।
অধ্যাদেশের ১ এর ২ উপধারায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন ও কার্যক্রমে পূর্ণরূপে চালু হওয়া সাপেক্ষে সরকার সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে ধারা-৭ এর বিধানাবলি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকরও করবে। ধারা ৭-এ বলা হয়েছে :
(১) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সার্ভিস প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হবে।
(২) সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কাজে রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবে।
(৩) সার্ভিস সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান সংক্রান্ত কার্যাদি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সচিব কর্তৃক সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট কমিটির পরামর্শের জন্য উপস্থাপিত হবে।
(৪) উপ-ধারা (৩)-এ উল্লিখিত কমিটির সদস্যরা নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপিল বিভাগের বিচারকগণ কর্তৃক মনোনীত হবেন।
(৫) উপ-ধারা (২)-এর বিধান সত্ত্বেও, আইন ও বিচার বিভাগ ও এর কার্যপরিধিতে বর্ণিত প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা এবং অন্য কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের দপ্তরে সার্ভিস সদস্যগণের পদায়ন বা বদলি সংক্রান্ত কার্যাদি এতদুদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত বিধিমালা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, সম্পাদিত হবে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এর আগে গত ২০ নভেম্বর অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বতন্ত্রীকরণ নিশ্চিতে প্রধান বিচারপতির উদ্যোগে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিল বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবতা কী? সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয়ের ব্যাপারে অন্তর্র্বর্তী সরকার গেজেট প্রকাশ করলেও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে এটা অনুমোদন করতে হবে। নয়তো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে আশা তৈরি হয়েছে তা মুখ থুবড়ে পড়বে। শাসন বিভাগের হস্তক্ষেপ মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারাই হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের সংবিধানেও স্বাধীন নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। মাজদার হোসেন মামলার রায়ের পর গত ২৬ বছরেও বিচার বিভাগ স্বাধীন হতে পারেনি। সবশেষ গত ৩০ নভেম্বর বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা জন্য সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
তবে এই পৃথক সচিবালয়ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট হবে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আইনজ্ঞরা। এ ব্যাপারে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এটি একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় ও এটি নিশ্চিত করার জন্য নাগরিকদের সজাগ দৃষ্টি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর সাংবিধানিক কাঠামোর প্রয়োজন। বিচার বিভাগকে স্বাধীন রাখতে হলে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে বিচারকরা যেন সরকারের অন্য কোনো বিভাগের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিরপেক্ষভাবে বিচারিক কাজ পরিচালনা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীন বিচার বিভাগের লক্ষ্যে মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনা এখনো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় হয়েছে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে এরপরও বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে না। এটি তো একটি শুধু আলাদা সচিবালয়, যা নিয়ন্ত্রণ করবে প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সেখানেও যদি সরকার হস্তক্ষেপ করে তাহলে কি তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন?’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় হয়েছে, এটা ভালো খবর। কিন্তু মাসদার হোসেন মামলার ১২ দফা নির্দেশনা তো বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য সরকারকে উদার হতে হবে। বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি কিংবা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রম, সব ক্ষেত্রেই সরকার চাইলে তার ক্ষমতা দেখাতে পারে। সেটা বিভিন্নভাবেই হতে পারে। কারণ কেউই তো সরকারের বাইরে নয়। তাই বিচার বিভাগ পৃথক হলেও সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।’ লক্ষণীয় যে, জারি করা অধ্যাদেশের ধারা ১ (২)-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘(২) সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপন সম্পন্ন ও ইহার কার্যক্রম পূর্ণরূপে চালু হওয়া সাপেক্ষে সরকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে, ধারা ৭-এর বিধানাবলি সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কার্যকর করিবে।’ অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইন হলেও তা বাস্তবায়ন হওয়ার আগপর্যন্ত বিচারকদের বদলি, পদায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধান-সংক্রান্ত বিষয় সরকারের অধীনই রয়ে গেছে।
তাই স্বাধীন বিচার বিভাগ বা পৃথক সচিবালয় আসলে শুভংকরের ফাঁকি বলে মনে করেন অনেকে। গেজেটে বলা হয়েছে, শুধু বিচারকাজে নিয়োজিত যারা আছেন, সেই বিচারকদের বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের হাতে চলে গেছে। কিন্তু বিচার বিভাগের যারা অন্য কোনো জায়গায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, যেমন নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, আইন কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয় আইন মন্ত্রণালয়ের হাতেই রয়ে গেছে। এখন বিচারপতি ও বিচারকদের জবাবদিহিতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে।
আর প্রধান বিচারপতির জবাবদিহিতা রাষ্ট্রপতির কাছে। প্রধান বিচারপতির নিয়োগ রাষ্ট্রপতির হাতেই আছে। রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। তাহলে প্রধান বিচারপতির নিয়োগ কীভাবে রাজনীতিমুক্ত হবে? তাহলে সত্যি কি স্বাধীন হলো বিচার বিভাগ? আর্থিক ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এখনো পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় যদি ৫০ কোটি টাকার কম হয় সে ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি এটা অনুমোদন করবেন। ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে এটা পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে একনেকের সভায় উপস্থাপন করবেন প্রধান বিচারপতি। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতের বাজেট অনুমোদন করা হবে। এ ছাড়াও এই সচিবালয়ও নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। এই সচিবালয়েও অন্তত ২৫ শতাংশ আমলা রাখার সুযোগ রয়েছে। তাই কাগজে কলমে স্বাধীন বলা হলেও আসলে কতটা স্বাধীন হলো বিচার বিভাগ? এ প্রশ্ন রয়েই গেল।
-সাইমুন










