রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ: ১,৪৩৮তম দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

(ছবি: রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কিয়েভে মেট্রো চলাচল বন্ধ থাকায় স্টেশনের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আছেন সাধারণ মানুষ। কিয়েভ, ইউক্রেন, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬। ছবি: আনাতোলি স্টেপানভ/রয়টার্স)

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ১,৪৩৮তম দিনের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:

যুদ্ধ পরিস্থিতি

ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় একজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহুতল ভবন, আবাসিক ঘরবাড়ি, দোকান ও ক্যাফে।

জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে গোলাবর্ষণে আরও একজন আহত হন। এতে তিনটি আবাসিক ভবন ধ্বংস হয় এবং ১২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছে জরুরি সেবা বিভাগ।

ডোনেৎস্ক অঞ্চলে বিভিন্ন জেলায় চালানো ১৩টি পৃথক রুশ হামলায় অন্তত দুইজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানান গভর্নর ভাদিম ফিলাশকিন। তিনি আরও জানান, সম্মুখসারির এলাকা থেকে ৩৫ শিশুসহ মোট ১৭২ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জাপোরিঝিয়া ও ডনিপ্রো অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় রেল অবকাঠামোতেও রুশ হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল ‘আমাদের শহরগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া’।

ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানায়, শনিবার জুড়ে মোট ৩০৩টি সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৩৮টি বিমান হামলা, ১১৯টি গাইডেড বোমা হামলা, ২ হাজার ৫১০টি কামিকাজে ড্রোন হামলা এবং বসতি ও সেনাদের লক্ষ্য করে ২ হাজার ৪৩৭টি আক্রমণ।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের বাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের পেত্রিভকা এবং পূর্ব ডোনেৎস্ক অঞ্চলের তোরেৎস্কে গ্রাম দখল করেছে। তবে আল জাজিরা এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস আরও জানায়, বছরের শুরু থেকে রুশ বাহিনী অন্তত ২৪টি ইউক্রেনীয় বসতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, যার বেশিরভাগই জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে।

এদিকে রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলে একটি গাড়িতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় দুইজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে তাস।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ

ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে কিয়েভে অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি ভবনে শনিবার সারাদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। কর্মকর্তারা জানান, মলদোভার সঙ্গে সংযোগকারী বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ফলে কিয়েভ মেট্রো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শত শত যাত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয় বলে টেলিগ্রামে জানান কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে পানির সরবরাহ পুনরায় চালু হলেও প্রায় ২ হাজার ৬০০টি বাড়িতে তাপ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছিল বলে জানান তিনি।

ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণ তদন্ত করছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ বা সাইবার হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে, লাইনে বরফ জমে যাওয়া এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে রুশ ড্রোন হামলা প্রতিরোধে স্পেসএক্স সাময়িকভাবে ইউক্রেনে তাদের স্টারলিংক সিস্টেমের কিছু কার্যক্রম সীমিত করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর প্রযুক্তি উপদেষ্টা সেরহিই বেসক্রেস্তনভ ফেসবুকে এ তথ্য জানান।

তিনি লেখেন, “এই ব্যবস্থার কারণে যারা সাময়িকভাবে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, তাঁদের কাছে আমি আবারও ক্ষমা চাইছি। তবে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়।”

রাজনীতি ও কূটনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, ফ্লোরিডায় রাশিয়ার বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভের সঙ্গে তাঁর ‘গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ’ বৈঠক হয়েছে।

তিনি বলেন, “এই বৈঠক আমাদের আশাবাদী করেছে যে রাশিয়া ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে কাজ করছে।” এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের’ প্রশংসাও করেন।

এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জশ গ্রুয়েনবাউম উপস্থিত ছিলেন।

রাতের ভাষণে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবংআ আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী বৈঠকগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে।

তিনি বলেন, “ইউক্রেন সব কার্যকর কাঠামোতেই কাজ করতে প্রস্তুত। আমাদের কাছে ফলাফলই মুখ্য, এবং বৈঠক হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা লিচেনস্টাইনের উপ-প্রধানমন্ত্রী সাবিনে মোনাউনি সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, আলোচনায় শান্তি আলোচনা, ইউক্রেনের জ্বালানি খাতের জরুরি প্রয়োজন এবং রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

সূত্রঃ আল জাজিরা

বেলাল হোসেন/