বিক্রির তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার ক্ষুদ্র শহর, ছাড়তে রাজি নন বাসিন্দারা

ছবিঃ সংগৃহীত

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের দুর্গম বনাঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত ক্ষুদ্র জনপদ লিকোলা যার জনসংখ্যা মাত্র পাঁচ এখন বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে। তবে শহরটির বাসিন্দারা এখান থেকে চলে যেতে নারাজ।

কয়েকটি কাঠের ঘর, একটি সাধারণ দোকান, একটি ক্যারাভান পার্ক ও একটি পেট্রল স্টেশন নিয়ে গড়ে ওঠা লিকোলা অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট শহরগুলোর একটি। মেলবোর্ন শহর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার গাড়ি পথ দূরে অবস্থিত এই জনপদটি কিনতে চাইলে প্রয়োজন হবে কয়েক মিলিয়ন ডলার। স্থানীয়দের বিস্ময় ও ক্ষোভের মধ্যেই পুরো শহরটি বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

লিকোলার মালিকানা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন লায়ন্স ক্লাব–এর হাতে ছিল। বহু বছর ধরে এটি আলপাইন ন্যাশনাল পার্কে যাতায়াতকারী পর্যটকদের জন্য জ্বালানি, খাবার ও বিশ্রামের নির্ভরযোগ্য বিরতি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি, প্রায় ৫০ বছর ধরে এটি সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও তরুণদের জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে।

তবে লায়ন্স ক্লাবের স্থানীয় শাখা জানিয়েছে, শহরটি পরিচালনার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। ফলে গত বছরের শেষ দিকে নীরবে অনলাইনে শহরটি বিক্রির জন্য তোলা হয়।

এই সিদ্ধান্তে লিকোলার অল্পসংখ্যক বাসিন্দা, আশপাশের এলাকার মানুষ এবং এমনকি রাজ্যের অন্যান্য লায়ন্স ক্লাব সদস্যদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শহরটির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

‘বাড়ির মতো এক আশ্রয়’

ভিক্টোরিয়ার উচ্চভূমিতে ম্যাকঅ্যালিস্টার নদীর তীরে অবস্থিত লিকোলা মূলত ১৯৫০–এর দশকে একটি কাঠকলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালে কাঠকলটি বন্ধ হয়ে গেলে লায়ন্স ক্লাব পুরো এলাকা অধিগ্রহণ করে এবং সেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ছুটির সময় আবাসিক ক্যাম্প চালু করে।

পরবর্তীতে তারা লিকোলা জেনারেল স্টোর ও ক্যারাভান পার্ক জমিটিও কিনে নেয়।

বর্তমানে লিয়ান ও’ডোনেল ও তাঁর পরিবারই শহরটির একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি জেনারেল স্টোরটি পরিচালনা করেন এবং তাঁর এক সন্তান, এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তাঁর দুই সন্তানকে নিয়ে সেখানে বসবাস করেন।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ও’ডোনেল বলেন,
“এটি সত্যিই অসাধারণ একটি জায়গা। এখানে এসে মানুষ আমাকে বলত, ‘লিকোলায় তুমি কখনো বড়লোক হতে পারবে না।’ আমি বলতাম, ‘কে বলেছে আমি বড়লোক হতে এসেছি?’”

২০২২ সালে ও’ডোনেল দোকানটি কিনলেও ভবনগুলোর মালিক নন। তিনি জানান, তাঁকে এমন একটি ইজারায় সই করানো হয়েছিল, যা ১৫ বছরের জন্য নবায়ন হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।

ও’ডোনেল বলেন, তিনি লিকোলাকে মানুষের জন্য ‘বাড়ির মতো এক আশ্রয়’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শহরে যাঁরা আসেন বা যাতায়াত করেন-ট্রাকচালক থেকে শুরু করে দমকল বাহিনীর সদস্য পর্যন্ত-প্রায় সবাই তাঁর ফোন নম্বর জানেন।

“দিন হোক বা রাত, সবাই প্রয়োজনে আমার সঙ্গেই যোগাযোগ করে,” বলেন তিনি।

তবে এখন তাঁকে দোকান ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে।

তিনি বলেন,
“আমি এই শহরটাকে প্রাণভরে ভালোবাসি। যদি এটি কোনো ডেভেলপারের হাতে পড়ে এবং এর স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যায়, তাহলে সেটা আমার হৃদয় ভেঙে দেবে।”

ও’ডোনেল জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি প্রথম জানতে পারেন যে শহরটি বিক্রির পথে যাচ্ছে। লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড তাঁকে জানায়, গত পাঁচ–ছয় বছর ধরে তাদের কার্যক্রম লোকসানে চলছে।

“আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি। তারা বলেছিল, কয়েক মিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে না পারলে কিছু করার নেই,” বলেন তিনি।

তিনি তহবিল সংগ্রহের প্রস্তাব দিলেও বোর্ড তা গ্রহণ করেনি। একপর্যায়ে তাঁকে জানানো হয়, জমি ও ভবনের মালিক যেহেতু লায়ন্স ক্লাব, তাই তাঁকে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে হবে।

আইনি পরামর্শ নেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, ইজারার শর্ত অনুযায়ী বোর্ড আইনগতভাবেই তা করতে পারে। কিন্তু লিকোলায় অন্য কোনো ভবন না থাকায় তাঁর ব্যবসা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও নেই।

গত ডিসেম্বরে তিনি অনলাইনে দেখতে পান, পুরো শহরটি ৬০ থেকে ১ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবাদ ও উদ্বেগ

শহরটি বিক্রির খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আশপাশের এলাকার মানুষ দোকান বন্ধ হলে পর্যটক ও স্থানীয়দের ভোগান্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

একটি অনলাইন পিটিশনে যেখানে ও’ডোনেলের ইজারা নবায়নের দাবি জানানো হয়েছে-ইতোমধ্যে আট হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।

চাপ বাড়তে থাকায় লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড জানায়, তাদের কর্মীরা হুমকি পাচ্ছেন এবং প্রয়োজনে তাদের শহর থেকে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

বোর্ডের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বীমা খরচ বৃদ্ধি, পুরোনো অবকাঠামো এবং ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে শহরটি আর পরিচালনাযোগ্য নয়।

বোর্ড চেয়ারম্যান ডেনিস ক্যারাদার্স বলেন, “আমাদের মূল দায়িত্ব সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের সহায়তা করা-শুধু স্থাপনা ধরে রাখা নয়।”

বোর্ড জানায়, বিক্রির অর্থ একটি নতুন তহবিলে বিনিয়োগ করা হবে, যা ভিক্টোরিয়া জুড়ে পেশাদারভাবে পরিচালিত ক্যাম্পে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।

লিকোলায় ভবিষ্যতে ক্যাম্প চালু থাকবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ক্যারাদার্স জানান, শহরটি কেনার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

সূত্রঃ বিবিসি

বেলাল হোসেন/