শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে গত বুধবার বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় এখনও সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এর আগের সন্ধ্যায় শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমের মৃত্যুর খবরে এমনিতেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর মধ্যেই রাতে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে গুজবে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবার সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ায়– সংঘর্ষে আহত ঝিনাইগাতী যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মারা গেছেন। মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে জেলা বিএনপির স্থগিত হওয়া কমিটির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দেন।
এদিকে শেরপুরে সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহতের ঘটনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে জানিয়েছে বিএনপি। দলটি বলেছে, এই সংঘাত এড়ানো যেত কিনা, নির্ধারিত সময়ের আগে একটি দল কেন সব চেয়ার দখল করে রাখল? সেই দলের লোকজন কেন সেখানে লাঠিসোটা জড়ো করল? সবার সম্মিলিত অনুরোধ উপেক্ষা করে সেই দলের প্রার্থী কেন সংঘাতের পথ বেছে নিলেন– এসব বিষয় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
অন্যদিকে শেরপুরের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিএনপির উস্কানিতেই এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে।
বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতার ফলে প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক। জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে থাকাকালে সরকার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংযম নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই। শেরপুরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কেন হলো সংঘর্ষ
ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে কীভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত– তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে। জেলা হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন ঝিনাইগাতীর ধানশাইল ইউনিয়নের জামায়াতের নেতা মাসুদ খন্দকার আবদুল খায়েরের ভাষ্য, অনুষ্ঠান শুরুর আগে তারা চেয়ারে বসা ছিলেন। বিএনপির লোকজন চেয়ার কম পেয়ে তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করেন। আমরা পাল্টা আক্রমণ করি। প্রশাসন দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আমাদের মাগরিব পর্যন্ত স্টেডিয়ামে বসিয়ে রাখে। মাগরিবের পর জামায়াতের লোকজন বেরিয়ে এলে বিএনপির ভাড়াটে গুন্ডা বাহিনী আমাদের ওপর আক্রমণ করে।
একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির নেতা শাজাহান আলী বলেন, ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই জামায়াতের নেতাকর্মীরা সব চেয়ার দখল করে নেয়। এ নিয়ে তর্ক হলে জামায়াতের লোকজন লাঠিসোটা, রডসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে আমাদের ধাওয়া করে পেটাতে শুরু করে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লুৎফর রহমান বলেন, যুবদল নেতা সাইফুলের মৃত্যুর খবরটি সঠিক নয়। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি, সে কোথায় আছে। তবে জেলা হাসপাতালে ভর্তি তাদের নেতা মো. আমজাদের অবস্থা খুব খারাপ। চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহে আছে সুজা ও আহত রাজা।
ইউএনও এবং ওসি প্রত্যাহার
সংঘর্ষের ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যে ঝিনাইগাতীর ইউএনও আশরাফুল আলম রাসেলকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ ছাড়া ঝিনাইগাতী থানার ওসি নাজমুল হাসানকেও প্রত্যাহার করে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়।
একই ঘটনায় গতকাল নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবে কমিশন। শেরপুরের ঘটনা নিন্দনীয়।
এর আগে এক বক্তব্যে সমকালকে ইউএনও আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছি। কোনো পক্ষপাতিত্ব ছিল না। দুপক্ষকেই নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও যৌথ বাহিনী সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। ঝিনাইগাতীর পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মিজানুর রহমান ভূঞা বলেন, এখন সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো মামলা হয়নি। অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কীভাবে মারা গেলেন জামায়াত নেতা রেজাউল করিম
জামায়াত নেতা রেজাউল করিমের মৃত্যু নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল বিকেলে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে প্রথম ও গ্রামের বাড়ি গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলা গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রেজাউল করিমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বিকেলে প্রথম জানাজার আগে শ্রীবরদীতে এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা জামায়াতের নেতারা রেজাউল করিম হত্যার ঘটনা পরিকল্পিত উল্লেখ করে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব লুৎফর রহমান বলেন, বুধবার মাগরিবের সময় ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসন, পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল ভাইকে নেতাকর্মীদের নিয়ে ঝিনাইগাতী বাজার হয়ে না সীমান্ত সড়ক দিয়ে শ্রীবরদী চলে যেতে বলেন। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান রুপন অনেকবার বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন বাদল ভাইকে। কিন্তু তিনি কথা শোনেননি। তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে বাজার হয়ে বের হতে যান, তখনই সংঘর্ষ বাধে।
এ বিষয়ে অবশ্য কথা বলেননি নুরুজ্জামান বাদল। সহকর্মী রেজাউল করিমের মৃত্যুতে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান। দুপুরে নুরুজ্জামান বাদল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার প্রাণের সহকর্মীকে গতকাল সুস্থ অবস্থায় সরকারি কর্মসূচিতে নিয়ে গেলাম। আজ তাঁর লাশ নিয়ে এলাকায় ফিরছি। কী জবাব দেবো তাঁর শতবর্ষী বাবাকে? সৎ, নির্লোভ ও সহজ-সরল রেজাউলকে এভাবে নির্মমভাবে বিএনপির সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করবে, তা কোনোদিন ভাবিনি। শহীদ রেজাউলের রক্ত বৃথা যাবে না।’
কথা হয় শেরপুর-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি পর্যালোচনা করলেই তার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না। প্রশাসনের লোকজন সবকিছু দেখেছে। অযথা আমাকে নিয়ে মিথ্যা কথা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এ মৃত্যুতে আমি শোকস্তব্ধ। মরহুম রেজাউল করিমের রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
বিচারের দাবিতে কঠোর কর্মসূচি দিতে পারে জামায়াত
শেরপুর-১ (সদর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাশেদ জানান, কেন্দ্রীয় নেতারা দলের নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী উপজেলার দায়িত্বশীল নেতারা সব বুঝেশুনে মামলা করবেন। হত্যার প্রতিবাদে পর্যায়ক্রমে বিক্ষোভ, হরতালের মতো কর্মসূচিও আসতে পারে। বিএনপি তাদের নেতার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে এখনও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।
শোকে মুহ্যমান রেজাউল করিমের স্বজনরা
নিহত জামায়াত নেতা রেজাউল করিমের গ্রামের বাড়িতে গতকাল গিয়ে দেখা যায়, শোকস্তব্ধ পুরো পরিবার। রেজাউলের বৃদ্ধ বাবা মাওলানা আবদুল আজিজ ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক। বাড়ির আঙিনায় ছেলের কবর খোঁড়া হয়েছে। ছেলের শোকে তাঁর চোখের জলও যেন শুকিয়ে গেছে।
প্রতিবেশীরা জানান, রেজাউল করিমের স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য আহাজারি করছেন। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। রেজাউলের এক মেয়ে ও এক ছেলে। বাবাকে হারিয়ে তারাও হতবিহ্বল।
৪২ বছর বয়সী রেজাউল ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার আরবিবিষয়ক প্রভাষক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সহকর্মী ও প্রতিবেশীরাও শোকগ্রস্ত।
-সাইমুন










