যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তুষারঝড়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু

ছবি: ডিপ্লোম্যাটিক ইনসাইট

সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আঘাত হানা ভয়াবহ শীতকালীন ঝড়ে দেশটি গভীর সংকটে পড়েছে। এই ঝড়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রাণঘাতী শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে, বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয় এবং তাপমাত্রা নেমে আসে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

ঝড়টি ভারী তুষারপাত, বরফবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার ভয়াবহ সংমিশ্রণ নিয়ে আসে। এর পরপরই প্রবেশ করা হিমশীতল আর্কটিক বাতাস উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও বিলম্বিত করছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলেও অস্বাভাবিক ও বিপজ্জনক শীত বিরাজ করছে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনও ভারী তুষারপাত অব্যাহত রয়েছে। কানেকটিকাটে ২২ ইঞ্চির বেশি এবং বোস্টনে ১৬ ইঞ্চির বেশি তুষার জমেছে। নিহতদের মধ্যে হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যু ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা, তুষারক্রীড়া ও তুষার পরিষ্কারের সময় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা রয়েছে। এক ঘটনায়, একজন ব্যক্তিকে বরফে ঢাকা অবস্থায় অচেতন পাওয়া যায়, তার হাতে ছিল একটি বেলচা।

নিউইয়র্ক সিটিতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাওয়ায় আরও আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এসব মৃত্যু ঝড়জনিত কি না, তা তদন্ত করে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারের কাজ চললেও Poweroutage.com-এর তথ্যমতে এখনও পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন রয়েছে। টেনেসি, টেক্সাস, মিসিসিপি ও লুইজিয়ানার মতো রাজ্যগুলো যেগুলো সাধারণত তীব্র শীতের সঙ্গে অভ্যস্ত নয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় ১৯ কোটি মানুষ চরম শীতের সতর্কতার আওতায় রয়েছে। গ্রেট লেকস অঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখানে মিনেসোটা ও উইসকনসিনে তাপমাত্রা নেমে গেছে মাইনাস ২৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (মাইনাস ৩০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত। দমকা হাওয়ার কারণে ‘উইন্ড চিল’ পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেক এলাকায় এক ফুটের বেশি তুষারপাত হয়েছে। নিউ মেক্সিকোর বোনিটো লেকে সর্বোচ্চ ৩১ ইঞ্চি (৭৮.৭ সেন্টিমিটার) তুষার জমেছে। বরফে ঢাকা গাছ ভেঙে পড়ায় ন্যাশভিলসহ বিভিন্ন শহরে পুনরায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, ফলে স্থানীয় প্রশাসন জরুরি উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে বাধ্য হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা জানান, ঝড়টির বিস্তৃতি এতটাই বড় যে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণত শীত মোকাবিলায় প্রস্তুত উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোও এবার দক্ষিণাঞ্চলে পর্যাপ্ত সহায়তা পাঠাতে পারছে না, কারণ তারাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

এই ভয়াবহ ঝড়ের পেছনে রয়েছে ‘স্ট্রেচড পোলার ভর্টেক্স’ আর্কটিক অঞ্চল থেকে আসা নিম্নচাপযুক্ত শীতল বায়ুর একটি বৃহৎ ভর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পোলার ভর্টেক্সের এমন অস্বাভাবিক আচরণ এখন আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে, যার পেছনে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে।

এবারের তুষার ছিল অস্বাভাবিকভাবে শুষ্ক ও হালকা, ফলে বাতাসে সহজেই উড়ে গিয়ে দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয় এবং পরিষ্কার কার্যক্রম ব্যাহত করে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা ও পিচ্ছিল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।

সূত্র:ডিপ্লেম্যাটিক ইনসাইট

সাবরিনা রিমি/