রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রথমবারের মতো এক টেবিলে বসেছে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার ধারাবাহিকতা হিসেবে শনিবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় চার বছর ধরে চলমান এই সংঘাত থামাতে তিন দেশের একসঙ্গে আলোচনায় বসা এটিই প্রথম উদ্যোগ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। গত বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই বছরের নভেম্বরে তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। তবে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্রদের আপত্তির মুখে ওই প্রস্তাবে পরে একাধিক সংশোধন আনা হয়।
সংশোধিত সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই শুক্রবার আবুধাবিতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির চিফ অব জেনারেল স্টাফ ইগর কস্তিউকভ ও বিনিয়োগবিষয়ক দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ। ইউক্রেনের পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান রুস্তম উমেরভসহ আরও কয়েকজন প্রতিনিধি।
শুক্রবারের বৈঠকের আলোচ্য বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে রুশ সংবাদ সংস্থা তাস সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, প্রাথমিক আলোচনা রুদ্ধদ্বারেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিকে বৈঠক চলাকালে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, আলোচনায় অংশ নেওয়া ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং তাঁরা করণীয় বিষয়ে সচেতন।
এর আগে এই বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উল্লেখ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন জেলেনস্কি। তিনি জানান, আলোচনায় ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলই মূল বিষয় হয়ে উঠবে। যদিও ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবে দনবাস অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা নিয়ে কিয়েভের তীব্র আপত্তি রয়েছে। শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, যুদ্ধ থামাতে হলে ইউক্রেনকে দনবাস ছাড়তেই হবে।
মস্কোয় চার ঘণ্টার আলোচনা
আবুধাবির বৈঠকের আগে বৃহস্পতিবার রাতে মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি জোস গ্রুয়েনবাউমও উপস্থিত ছিলেন। তিনি গাজা ‘বোর্ড অব পিস’-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বৈঠকের আগে উইটকফ সাংবাদিকদের জানান, দীর্ঘ আলোচনার পর এখন কেবল একটি বিষয়েই মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
সমস্যাটি কী, তা স্পষ্ট করেননি উইটকফ। তবে বৈঠকের পর ক্রেমলিনের কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ জানান, মূল বিরোধ ভূখণ্ডগত ইস্যু নিয়ে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মার্কিন প্রতিনিধিদের জানানো হয়েছে—গত বছর আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, সেই কাঠামোর ভিত্তিতে ভূখণ্ড সমস্যার সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব নয়।
পুতিনের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠককে ‘গঠনমূলক ও অত্যন্ত খোলামেলা’ বলে বর্ণনা করেন উশাকভ। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেন সংকটের কূটনৈতিক সমাধানে পুতিন আগ্রহী। তবে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানের লক্ষ্য অর্জনে মস্কো এগিয়ে যাবে। যুদ্ধক্ষেত্রে বর্তমানে রাশিয়াই এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপসহ ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে আছে পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল, যার প্রায় ৮০ শতাংশ রাশিয়ার দখলে। যুদ্ধ থামাতে বাকি অংশ থেকেও ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে মস্কো। তবে কিয়েভ স্পষ্ট করে বলেছে, জনগণের সম্মতি ছাড়া তারা কখনোই ভূখণ্ড ছাড়বে না।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চূড়ান্ত
ভূখণ্ড ইস্যুর পাশাপাশি যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে কিয়েভের। এর মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে রাশিয়ার হামলা ঠেকানোর নিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। তবে বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পর এসব বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন জেলেনস্কি।
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককে ‘গঠনমূলক’ উল্লেখ করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সংক্রান্ত শর্তগুলো চূড়ান্ত হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বিষয়ে একটি চুক্তিও প্রায় সম্পন্নের পথে। অন্যদিকে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রতি তাঁর স্পষ্ট বার্তা—ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটতেই হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বড় অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। তীব্র শীতের মধ্যে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়ায় তিন হাজারের বেশি ভবনে হিটার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই শুক্রবারও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পাওয়া গেছে।
তবে আবুধাবির এই বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতির আশা দেখছেন না আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর ইউরোপবিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা স্টিভ এরল্যাঙ্গার। আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দনবাস প্রশ্নে রাশিয়ার অবস্থানে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। যুদ্ধ থামাতে এই বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। দনবাস ইস্যুর সমাধান না হলে আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সূত্র: রয়টার্স
-আফরিনা সুলতানা/










