এই অল্প কয়েক দিনেই কি বিশ্ববাসী ভেনিজুয়েলায় ঘটে যাওয়া বিরল ঘটনা ভুলে যেতে বসল? নাকি গ্রিনল্যান্ডের উত্তেজনা ভেনিজুয়েলা ইস্যুকে ছাপিয়ে গেল? আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া
ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে। সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তো অবশ্যই সম্প্রসারণবাদের বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন, বৃহৎ রাষ্ট্রের যা খুশি, তা করার বিপজ্জনক এক দৃষ্টান্ত হিসাবেই রয়ে যাবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই কাণ্ড ভেনিজুয়েলায় দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অশান্তি ও গৃহযুদ্ধের হুমকি এবং লাতিন আমেরিকা জুড়ে সংঘাত বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য ব্যবহƒত অজুহাত অগ্রহণযোগ্য। ব্যাবসায়িক বাস্তববাদের ওপর আদর্শিক বৈরিতা জয়লাভ করেছে।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে আনতে গিয়ে গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের বিমানঘাঁটি, সামরিক ঘাঁটি, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে হামলা চালান। এ হামলায় সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছে। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় ন্যায়সংগতভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত সরকার পরিচালনার এবং ভেনিজুয়েলার তেলখনিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোকে পাঠানোর ঘোষণা দেন।
কানে হেডফোন লাগানো, হাতে হাতকড়া ও কোমরে বেঁধে এক রাষ্ট্রের বৈধ প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই দৃশ্য কি বার্তা বহন করে? মধ্যযুগীয় কোনো সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের দৃশ্য? দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলোÑএটি আজকের তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর এক ভয়ংকর রাজনৈতিক ও অর্থথনৈতিক আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক। এই দৃশ্য সরাসরি ক্ষমতা বদলের ঘোষণা শুধু লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য একটি অশনিসংকেত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভেনিজুয়েলায় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশটির শাসনভারও কার্যত তারাই দেখভাল করবে। অনেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো।
এই হামলা ও গ্রেফতার ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাসের তীব্র চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিকতারই অংশ। গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনিজুয়েলার উপক‚লে বড় আকারের নৌবহর মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে বিমান হামলা চালানো হয় এবং ভেনিজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনিজুয়েলার অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’সহ কয়েকটি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলার তেল ট্যাংকার জব্দ এবং দেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়।
মূলত ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের উদ্দেশ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। হুমকি ও বø্যাকমেইলের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন আবারও শক্তির আশ্রয় নিয়েছে। এই আগ্রাসন দেশটির জনগণের স্বাধীন ইচ্ছা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি আঘাত। এই হামলায় ভেনিজুয়েলার কারাকাস ও দেশটির অন্যান্য অঞ্চলের বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বাধীনতার সর্বজনস্বীকৃত নীতিমালার চরম লঙ্ঘন। এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলবে এবং লাখ লাখ ভেনিজুয়েলাবাসীর জীবন বিপন্ন করবে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
ভেনিজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা ভিয়েতনাম বা ইরাক যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। কোনো দেশের জনগণ কখনোই বিদেশি শাসন মেনে নেয় না। ভেনিজুয়েলায় মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিরোধের জš§ দেবে এবং এটি ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো একধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
ভেনিজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের কার্যকর সমাধান করবে ওয়াশিংটন। প্রশ্ন উঠেছে, এটা কি আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন করে? নাকি খোলামেলা দখলদারত্ব? জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এসব শব্দ কি এখন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য?
ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর শাসনকে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসন বলার অবকাশ নেই। তার সরকারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র নস্যাতের অভিযোগ আছে। কিন্তু, স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ভেনিজুয়েলার সরকার কে পরিচালনা করবে, কোন পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পরিচালিত হবে, সেটা নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার ভেনিজুয়েলার নাগরিকদের। কোনো বৃহৎ শক্তির নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও এর পশ্চিমা মিত্ররা সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উপায় হিসাবে পরোক্ষ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে বিভিন্নভাবে। যদিও ইতিহাস প্রমাণ করে, সম্পদ দখলের এই নব্য উপনিবেশবাদী অপচেষ্টা কখনোই সফলতা পায়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ প্রতিটি ক্ষেত্রে মার্কিনিদের পশ্চাদপসরণ ও পরাজয়ের অপমানজনক ইতিহাস রয়েছে। অনেক অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, রক্তপাত ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর খেসারত সেই অঞ্চল ছাপিয়ে পুরো বিশ্বকেই শোধ করতে হয়েছে।
ভেনিজুয়েলার জনগণকেই ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক ভাগ্যের নির্ধারক হওয়ার সুযোগ করে দেয়। ক্যারিবীয় অঞ্চলের গণতান্ত্রিক দেশ ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলায় দেশটির জনগণ এখন দিশেহারা। যুক্তরাষ্ট্র তাদের তথাকথিত মনরো ডকট্রিন পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করে ভেনিজুয়েলায় সামরিক কায়দায় হামলা করে, যার প্রতিক্রিয়ায় সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠেছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সাধারণ জনগণ প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইরান, কলম্বিয়া ও কিউবাসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘটনা থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের কাজ করতে উৎসাহিত হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তির কফিনে সম্ভবত সবশেষ পেড়েকটি ঠুকে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল নীতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
লেবানন ও ইরানে এবং অতি সম্প্রতি সিরিয়ায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যৌথ হামলার সঙ্গে ভেনিজুয়েলার ঘটনার মিল রয়েছে। এসব হামলা প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
সিএনএনের এক এক জরিপে জানা গেছেÑযুক্তরাষ্ট্রের এ হামলা মার্কিন জনগণের অধিকাংশই সমর্থন করছে না। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে ৬৩ শতাংশ বনাম ২৫ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ ইউ-গভ জরিপে ৭০ শতাংশ বনাম ৩০ শতাংশ মানুষ সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান করছে।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে একটি সরকার থাকে। সেটি হতে পারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার, রাজতান্ত্রিক সরকার, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার বা অগণতান্ত্রিক সরকার। ভেনিজুয়েলায়ও একটি সরকার ছিল। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। নির্বাচনে কারচুপি হতে পারে। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা যেতে পারে যে, তিনি সুষ্ঠুভাবে ভোট করেননি এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি। যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ভেনিজুয়েলার জনগণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করতে পারে। তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানাতে পারে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তার পতনের জন্য কঠোর আন্দোলন সংগ্রাম হতে পারে। আন্দোলন সংগ্রাম করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম করে অগণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। যেমন ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, ফিলিপাইনের মার্কোসসহ অনেককেই পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং কেউ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু কথিত অভিযোগে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে সামরিক হামলা করে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। এই হামলা সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী চরিত্র এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রতি তাদের অবজ্ঞাকে উšে§াচিত করেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘অথর্ব’ চরিত্রকেও সামনে নিয়ে এসেছে। মাদকের অজুহাতে এই হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ভেনিজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা এবং প্রতিক্রিয়াশীল ধনিক-অলিগার্ক শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধে জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া।
ভেনিজুয়েলায় নগ্ন সামরিক আগ্রাসনে বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ কি কখনো শুনতে পাবেন বিশ্ব মানবতা ও গণতন্ত্রের সোল এজেন্ট দাবিদার বিশ্বমোড়লরা।
-সাইমুন










