জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করেছেন আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করেছেন আদালত। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের শুনানি নিয়ে বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজি এম এইচ তামিম, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান ও প্রসিকিউটর মো. মামুনুর রশীদ। আসামি জুনাইদ আহমেদ পলকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মো. লিটন আহমেদ। পলাতক সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে জয়ের রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী ছিলেন মো. মুনজুর আলম।
এই মামলার আসামি সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক। অপর আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তাকে আজ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদনে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসত জয়ের কাছ থেকে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেন পলক। অভিযোগের বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এসব অভিযোগের সঙ্গে জয়-পলকের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করা হয়।
গত ৪ ডিসেম্বর জয় ও পলকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল । একইদিনে জয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আর পলককে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ট্রাইব্যুনালে জয় ও পলকের মামলা একসঙ্গে চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর ১০ ডিসেম্বর সজীব ওয়াজেদ জয়ের হাজির হওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে তিনি উপস্থিত না হওয়ায় ১৭ ডিসেম্বর তাকে পলাতক আসামি হিসেবে ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় খরচে (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী নিয়োগ করা হয়।
গুমের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু ॥ আওয়ামী লীগের শাসনামলে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের পর এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। এর আগে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে গত ২৩ ডিসেম্বর এই মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল -১।
এই মামলার ১৭ জন আসামির মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ১০ সেনা কর্মকর্তা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম এবং কে এম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লে. কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
এই মামলায় পলাতক সাত আসামি হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।
আযাদের আত্মসমর্পণ ॥ একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম মৃত্যুদ-প্রাপ্ত পলাতক আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আত্মসমর্পণ করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়েছেন। বুধবার সকালে তিনি ট্রাইব্যুনালে আসেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজি এমএইচ তামিম। জানা গেছে, গত বছর নিজের সাজা স্থগিতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন আবুল কালাম আজাদ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী এই আবেদন করেন তিনি।
২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান তাকে মৃত্যুদ- দিয়ে রায় ঘোষণা দেন। আদেশে তার বিরুদ্ধে প্রদত্ত দ-াদেশ আদালতে আত্মসমর্পণপূর্বক আপিল দায়েরের শর্তে এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মোট ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। তার মধ্যে ৭টিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। ৩টিতে তার মৃত্যুদ-, ৪টিতে কারাদ- দেওয়ার সুযোগ থাকলেও মৃত্যুদ- দেওয়ার কারণে সে সব অপরাধের বিষয়ে দ-াদেশ দেননি ট্রাইব্যুনাল। অপর একটি অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় সেটি খারিজ করা হয়।
আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে ১৪ জনকে হত্যা, ৩ নারীকে ধর্ষণ, ৯ জনকে অপহরণ, ১০ জনকে আটকে রাখা, ৫ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ১৫টি বাড়ির মালামাল লুণ্ঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তার বিরুদ্ধে ঘোষিত এ রায়ের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম কোনো মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। তবে পলাতক থাকায় তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা সম্ভব হয়নি। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগেই পালিয়ে ভারত হয়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।










