১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় পার হওয়ার পর ইসি সচিবালয় থেকে জানানো হয়েছে, এবারের নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে সর্বমোট ১,৯৬৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারা দেশে মোট ৩০৫ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
প্রার্থী তালিকার চূড়ান্ত চিত্র:
ত্রয়োদশ সংসদে ২৯৮টি আসনে মূল লড়াইয়ে টিকে আছেন দেড় হাজারের বেশি প্রার্থী। ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে বর্তমানে প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ১,৯৬৭ জন (প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী)। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর।
বিএনপি: দলটির মনোনীত প্রার্থী রয়েছেন ২৮৩টি আসনে। বাকি ১৭টি আসন তারা যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী: দলটির নিজস্ব প্রার্থী আছেন ২১৫টি আসনে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের অন্যান্য শরিকরা বাকি আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী: এবারের নির্বাচনে ৪ শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়া স্থানীয় হেভিওয়েট নেতা।
জোটের হিসাব ও রাজনৈতিক মেরুকরণ
এবারের নির্বাচন মূলত দ্বিমুখী নয়, বরং বহুমুখী লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রধানত তিনটি ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
১. বিএনপি ও যুগপৎ শরিক: বিএনপি তাদের জোটের অন্যতম শরিক গণঅধিকার পরিষদকে ২টি এবং জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের দুই অংশকে ৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছে। শরিকদের প্রার্থীরা অনেকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকেও লড়ছেন।
২. জামায়াত ও ১০ দলীয় ঐক্য: জামায়াতে ইসলামীসহ ১০টি সমমনা দল একটি শক্ত নির্বাচনী মোর্চা গড়েছে। এর মধ্যে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’ থেকে ৩টি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। তবে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’ এই জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
৩. বাম ও অন্যান্য: জাতীয় পার্টি (জাপা), সিপিবি, বাসদ এবং এবি পার্টিসহ বেশ কিছু নিবন্ধিত দল এককভাবে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছে।
গণভোট ২০২৬: নির্বাচনের সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতা
১২ ফেব্রুয়ারি কেবল ৩০০ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়, বরং দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটাররা একই কেন্দ্রে দুটি ব্যালট পাবেন। একটিতে সংসদ সদস্য নির্বাচন করবেন এবং অন্যটিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ৩০টি প্রস্তাবের ওপর ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, এই গণভোটের মাধ্যমেই আগামী সংসদের রূপরেখা নির্ধারিত হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে।
পাবনা-১ ও ২ আসনে ব্যতিক্রমী তফসিল
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে পাবনা-১ ও ২ আসনের তফসিল কিছুটা সংশোধন করা হয়েছে। এই আসন দুটিতে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় আগামী ২৬ জানুয়ারি। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই আসনগুলোতেও ভোটগ্রহণ সারা দেশের সঙ্গে একই দিনে অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারিই অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচারণার রণধ্বনি
আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকাল থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তারা সারা দেশে প্রতীক বরাদ্দ শুরু করেছেন। বিএনপি প্রার্থীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াত প্রার্থীরা ‘দাঁড়ি পাল্লা’ প্রতীক বুঝে নিচ্ছেন। প্রতীক পাওয়ার পর আগামীকাল ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে জনসভা, পথসভা ও পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণায় নামতে পারবেন।
নিরাপত্তা ও বর্তমান পরিবেশ
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে যৌথ বাহিনী। গতকাল মিরপুরে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের পর নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনী নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভোটারদের মধ্যে উত্তেজনা ও শঙ্কা থাকলেও ১০ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশায় দেশবাসী ভোটকেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছে।