ভারতেই রূপান্তরের গল্প লিখলেন ড্যারিল মিচেল

ওয়ানডেতে ড্যারিল মিচেলের সর্বশেষ তিন ইনিংস – ৮৪, ১৩১* ও ১৩৭ । ব্যাট হাতে এমন দাপট দেখিয়েই ভারতের বিপক্ষে ইতিহাস গড়েছে নিউজিল্যান্ড। ভারতের মাটিতে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের নায়ক মিচেল, যার ব্যাট থেকে এসেছে ৩৫২ রান। সিরিজসেরার পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতেই।

এই সিরিজ পারফরম্যান্সে ওয়ানডে ব্যাটারদের র‍্যাঙ্কিংয়েও লাফ দিয়েছেন মিচেল। শীর্ষে থাকা বিরাট কোহলির থেকে এখন তিনি মাত্র এক পয়েন্ট পিছিয়ে। অথচ এই ভারতেই একসময় নিজের ব্যাটিং নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছিলেন কিউই এই ব্যাটার। সেই পথ হারানো মিচেলের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে লেগেছে দীর্ঘ ছয় বছর।

২০১৩ সালে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করার পর নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের হয়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফরের সুযোগ পান ড্যারিল মিচেল। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দুঃস্বপ্ন। উপমহাদেশের স্পিনারদের সামনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হতে থাকেন ডানহাতি এই ব্যাটার। তখন যে কুলদীপ যাদবদের সামনে অসহায় ছিলেন, সেই মিচেলই আজ একই বোলারদের অনায়াসে খেলছেন মাঠের চারদিকে।

এই ব্যর্থতার পর মূল জাতীয় দলে জায়গা পেতে তাঁর লেগে যায় ছয়টি দীর্ঘ বছর। একসময় যে ভারত তাঁকে থামিয়ে দিয়েছিল, আজ সেই ভারতেই দাঁড়িয়ে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন।

বর্তমান ক্রিকেটে খুব কম ব্যাটারই আছেন, যারা স্পিন বা পেস দুই ধরনের বোলিংয়ের বিরুদ্ধেই ‘ভি’ অঞ্চলে এত ধারাবাহিকভাবে শট খেলতে পারেন। একসময় আগেভাগে বল আন্দাজ করে খেলতে গিয়ে বারবার ফাঁদে পড়তেন মিচেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

ইউটিউব চ্যানেল ক্রিকেট মেন্টরিং-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিচেল বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডে বড় হওয়া, এরপর পার্থে খেলা—এই কন্ডিশনগুলোতে আমি কখনো উপমহাদেশের মতো স্পিনের মুখোমুখি হইনি। ওই সফর আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। বুঝেছিলাম, সব জায়গায় একভাবে খেললে চলবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভালো স্পিনারের সামনে পায়ের ব্যবহার না জানলে আপনি শেষ। এটা বুঝতে আমার কয়েক বছর লেগেছে।’

এই মানসিক দৃঢ়তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন তাঁর বাবা। ড্যারিল মিচেলের বাবা ছিলেন অল ব্ল্যাকস রাগবি দলের খেলোয়াড় ও ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ডের পরিচিত কোচ। বাবার কঠোর অনুশাসন ও ধৈর্যই মিচেলের মানসিক শক্তির ভিত্তি গড়ে দেয়।

বাড়ির পেছনের লনে নেট বসিয়ে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। অন-সাইডে ছক্কা মারতে হলে বল হিপের নিচে রাখতে হতো, স্লিপে ক্যাচ হলে আউট। লক্ষ্য ছিল ১২ বলে ১৫ রান। এই শৃঙ্খলাই ধীরে ধীরে মিচেলকে শেখায় নিজের দুর্বলতা নিজে খুঁজে বের করতে।

পরে পার্থে বসবাসের সময় মার্কাস স্টোইনিস, মার্কাস হ্যারিসদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং জাস্টিন ল্যাঙ্গারের মতো কোচদের সংস্পর্শে এসে তাঁর ব্যাটিং আরও পরিণত হয়।

২০১৮-১৯ মৌসুমে টেস্টে অভিষেক, ২০২১ সালে ওয়ানডে দলে স্থায়ী জায়গা। এরপর থেকেই বদলে যেতে থাকে তাঁর ক্যারিয়ারের গ্রাফ। বর্তমানে ওয়ানডেতে মিচেলের গড় ৫৮.৪৭। ৫৪ ইনিংসে করেছেন ২৬৯০ রান, সেঞ্চুরি ৯টি, ফিফটি ১২টি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যান স্পিনারদের বিপক্ষে। প্রায় ৭০ গড়ে ১২৫৯ রান করেছেন মিচেল, ৪৯ ইনিংসে স্পিনারদের কাছে আউট হয়েছেন মাত্র ১৮ বার।

একসময় যে দুর্বলতা তাঁকে আটকে দিয়েছিল, সেটিকেই শক্তিতে পরিণত করে আজ বিশ্বসেরা ব্যাটারদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন ড্যারিল মিচেল। নিজেকে ভেঙে আবার গড়ে তোলার এই গল্প শুধু ক্রিকেট নয়, খেলাধুলার জগতে এক অনুপ্রেরণার নাম।

-এমইউএম