গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারণা, নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ব্যাপক প্রচারণায় নেমেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ভোটের মাত্র এক মাস আগে সরকারের এই সক্রিয় অবস্থান জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—উভয়ের নিরপেক্ষতা নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞরা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পাশাপাশি চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এসব বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বার্তা ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার মাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করেছে।

প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘গণভোটে হ্যাঁ-তে সিল দিন’ শিরোনামে ফটোকার্ড ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এসব ভিডিওতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনকারী, নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং গুম কমিশনের সদস্যদের বক্তব্য তুলে ধরে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।

সরকারি প্রচারণায় বলা হচ্ছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লে নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের পথ খুলবে, আর ‘না’ ভোট দিলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই বার্তাকে সামনে রেখে ব্যাংক কর্মকর্তা, স্কুল–কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব যেখানে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন, সেখানে গণভোটে সরাসরি একটি পক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সরকারের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত কেবল গণভোটের বিষয়বস্তু ও ভোট প্রদানের পদ্ধতি নিয়ে নির্দেশনা দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষ করে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা যেহেতু নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন, তারা যদি এই প্রচারণায় সক্রিয় হন, তাহলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গণভোটে সরকারের পক্ষ নেওয়ার প্রভাব জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পড়তে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে এই নির্বাচন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন, সরকারের এই প্রচারণায় কোনো আইনি বাধা নেই। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে আইনি জটিলতা না থাকলেও অতীতের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনও ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

গণভোটে যেসব বিষয়ে ভোট

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে চারটি বিষয়ে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। সেগুলো হলো,জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন, ভবিষ্যতে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু, জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন।

সরকারের প্রচারণায় বলা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও পিএসসি গঠনে সরকার ও বিরোধী দল যৌথভাবে ভূমিকা রাখবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সব ব্যাংক শাখায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যানার টানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার নির্দেশনার কথাও উঠে এসেছে।

এ ছাড়া জুমার খুতবায় আলোচনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানার সামনে ব্যানার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন মাধ্যমেও প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান

আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই গণভোট ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, সংস্কারের পক্ষে থাকায় তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট সমর্থন করছেন।

অন্যদিকে বিএনপি জানিয়েছে, গণভোটের প্রচারণা চালানো তাদের দায়িত্ব নয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জনগণই ঠিক করবে তারা ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোট দেবে। বিএনপির দাবি, তাদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র ও তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আসনভিত্তিক প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মত

আইন বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন, নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের ব্যাপক প্রচারণা সেই নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করছে।

তার মতে, সরকারের অবস্থানের কারণে গণভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকছে না। ভবিষ্যতে কেউ আদালতে গিয়ে বলতে পারেন, পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার কারণে গণভোট সুষ্ঠু হয়নি।

তিনি আরও বলেন, সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বেশি হলেও গণভোটে অংশগ্রহণ কম হলে সরকারের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। আবার সরকারপক্ষীয় প্রচারণার পরও যদি ‘না’ ভোট বেশি পড়ে, সেটিও সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সব মিলিয়ে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই গণভোট ঘিরে সরকারের সক্রিয় প্রচারণা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নতুন এক বিতর্কের মুখে ফেলেছে—যার প্রভাব ভোটের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা পড়বে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

-এম ইউএম