আমদানিতে ভেস্তে যাচ্ছে দেশীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্প

* প্রায় ৯০ শতাংশ মেডিকেল ডিভাইস সরবরাহ করা হয় আমদানির মাধ্যমে
* নীতিমালার মাধ্যমে দেশে প্রতিযোগিতামূলক শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব
* দেশে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের আমদানি বন্ধ করার দাবি প্রস্তুতকারকদের

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ভিত্তি হলো সুরক্ষিত ও কার্যকর মেডিকেল ডিভাইস। ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি, ইমেজিং মেশিন, সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট, হাসপাতাল সরঞ্জাম, সিরিঞ্জ, ইন্ট্রাভেনাস ইনফিউশন বা আইভি সেট, পারসোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) এসব ছাড়া আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কল্পনাই করা যায় না। অথচ ওষুধ শিল্পের মতোই একটি সম্ভাবনাময় এ খাতটির বিকাশ ঘটছে না দেশে। আমদানিনির্ভর পরিকল্পনায় সকল সম্ভাবনা ভেস্তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।

তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও আমদানির ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনার কারণে এ শিল্পের সম্ভবনা নষ্ট হচ্ছে। শুল্ক কমিয়ে আনা এবং একটি নীতিমালা থাকলে দেশে শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল ডিভাইস শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এমনকি এসব শিল্পে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়াও সম্ভব।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেডিকেল ডিভাইসেস অ্যান্ড সার্জিকেল ইনস্ট্রুমেন্টস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স (বিএএমডিএসআইএমই) অ্যাসোসিয়েশনের এর তথ্য বলছে, দেশে মেডিকেল ডিভাইসের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। যা যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ নানা দেশ থেকে আসে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। এর ফলে বিদেশি মুদ্রার ওপর চাপ পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, নীতি সহায়তার অভাব, উৎপাদন উপযোগী কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সীমিত বিনিয়োগ, খণ্ডিত বাজার কাঠামো, সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্যের অভাব এবং শুল্ক জালিয়াতি- এসব সমস্যার কারণে দেশীয় উৎপাদন সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এ খাতে সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারবে না, বরং তা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

জানা গেছে, দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে অপসো স্যালাইন এবং ১৯৯৯ সালে জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড মেডিকেল ডিভাইস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এরপর আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি সিরিঞ্জ, স্যালাইন সেট, রক্ত পরিবহন টিউব, পিপিইসহ নানা পণ্য ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

২০২৫ সালে বৈশ্বিক চিকিৎসা সরঞ্জামের বাজারের মূল্য প্রায় ৫০১ থেকে ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বাজারের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হার প্রায় ৫ থেকে ৮ শতাংশ হলেও হাল আমলের ডিজিটাল হেলথ, পরিধানযোগ্য এবং সক্রিয় ডিভাইজ খাতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত।

প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান গেটওয়ের নির্বাহী পরিচালক (বিজনেস) সাঈদ হোসেন চৌধুরী বলেন, দদেখা গেছে একটি সরঞ্জাম উৎপাদনের ৮০ শতাংশ উপাদান দেশে আছে। মাত্র ২০ শতাংশ আমদানি করা প্রয়োজন। কিন্তু ২০ শতাংশ আমদানি করতে গিয়ে মোট পন্যের যে ব্যয় দাঁড়ায় তা তৈরিকৃত সরঞ্জামের আমদানি মূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এক্ষেত্রে যেটুকু আমাদের আমদানি প্রয়োজন সরকার সেটুকু সহযোগিতা করলে আমরা কোয়ালিটিফুল সরঞ্জাম তৈরি করতে পারি। তিনি বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পে কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) সুবিধা প্রদান, রপ্তানি প্রণোদনা ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশ করা এবং ন্যূনতম ১০ বছর বহাল রাখা, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশেষায়িত পাঠ্যক্রম চালু, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শল্যচিকিৎসাযন্ত্র খাতকে পৃথক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি ও নীতি সহায়তা প্রদান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অধীনে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, দেশে উৎপাদনযোগ্য পণ্যের আমদানি বন্ধ করা, চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু এবং দীর্ঘদিন ধরে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন।

বিএএমডিএসআইএমই এর সভাপতি মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের ঔষধ শিল্পে সাফল্যের বিপরীতে চিকিৎসা সরঞ্জাম শিল্পের চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। এমন সম্ভাবনাময় একটি খাত হওয়া স্বত্তেও এই শিল্পের বিকাশ হচ্ছে না। আমদানিনির্ভর পরিকল্পনায় সকল সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, নীতি সহায়তার অভাব, উৎপাদন উপযোগী কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সীমিত বিনিয়োগ, খণ্ডিত বাজার কাঠামো, সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্যের অভাব এবং শুল্ক জালিয়াতি এসব সমস্যার সমাধানে সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল আমদানিনির্ভরতা কমাতে পারবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। পাশাপাশি বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর হাজারো বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু তাদের জন্য যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মেডিকেল ডিভাইস শিল্পের পূর্ণ বিকাশ হলে এ খাতে লাখো কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের উন্নয়নে সবার আগে একটি নীতিমালা প্রয়োজন। তাছাড়া আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভারত ও চীন নিজেরাই কাঁচামাল উৎপাদনকারী। অন্যদিকে আমাদের কাঁচামাল বেশিরভাগ আমদানিনির্ভর। এ অবস্থায় দেশীয় শিল্পের বিকাশে চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের রপ্তানিতে বিদ্যমান ৬ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশ করতে হবে এবং এই সুবিধা ন্যূনতম ১০ বছর বহাল রাখতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্প এবং ওষুধ শিল্প থেকে অর্জিত আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম দেশজুড়ে সহজলভ্য হলে স্বাস্থ্যসেবার মানও উন্নত হবে। বাংলাদেশের উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় রপ্তানির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত নীতিমালা এই খাতকে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।
এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পদক্ষেপ জানতে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. কামীম হায়দারকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. আকতার হোসেন জানান, আমদানির ক্ষেত্রে কোন বাধানিষেধ নেই। তবে সকল নিয়ম মেনেই আমদানি করা হয়। যেহেতু আমাদের ৯০ ভাগ সরঞ্জাম আমদানি করা হয়। সেক্ষেত্রে যারা আমদানি করেন তাদেরকে নিয়েই আমরা আলোচনা করে থাকি। আমাদের সাথে মিটিংয়ে তারাও উপস্থিত থাকেন। শুল্ক কমানোর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুল্ক কমানোর এখতিয়ার আমাদের নেই। তবে দেশীয় উদ্যোক্তারা যদি আমাদের সাথে সমস্যার কথা আলোচনা করেন তবে আমরা তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সুষ্ঠু সমাধানে যেতে পারব বলে আশা করি।

বায়েজীদ মুন্সী, সিনিয়র রির্পোটার