আট বছর ধরে ডিপ্রেশনে ছিলাম:রাশমি

ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ রাশমি দেশাই দর্শকপ্রিয় ধারাবাহিক ‘উত্তরণ’ এবং ‘দিল সে দিল তাক’-এর মাধ্যমে একটি আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সম্প্রতি অভিনেত্রী নিজের জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় নিয়ে প্রথমবার মুখ খুলেছেন। তিনি জানান, তার জীবনের একটি দীর্ঘ সময় তিনি ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করেছেন, যা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।

জুমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশমি দেশাই বলেন, “একটা সময় ছিল যখন আমি আট বছর ধরে ডিপ্রেশনে ছিলাম। আমার অনেক মানসিক বোঝা ছিল। এটা ছিল অন্ধকার এক অধ্যায়ের মতো। মানসিক চাপ আমার জীবনকে শেষ করে দিতে বসেছিল। কিন্তু সেই জায়গা থেকে আমি ফিরে এসেছি। সবকিছু বাদ দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে আমার অনেক বছর লেগেছে। তাই আমার মনে হয়, নিজের জীবনের উথ্থান আর পতন আপনাকেই ঠিক করতে হয়।”

রাশমি আরও বলেন, “আপনার কাজের যাত্রা কেউ ঠিক করে দেয় না। কাজ আমাকে শান্তি দেয়। এটিই ছিল আমার ‘এস্কেপ ওয়ার্ল্ড’, যেটা আমি খুব দেরিতে বুঝতে পেরেছি। এখন আমি কাজ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য রাখছি।” তার কথায় বোঝা যায়, অভিনয় কেবল একটি পেশা নয়, বরং মানসিক চাপের সময় তার জন্য সুরক্ষার জায়গা এবং মানসিক শান্তির উৎস হয়ে উঠেছিল।

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাশমির জীবনে শুধুমাত্র পেশাগত চ্যালেঞ্জ নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি দীর্ঘ সময় মানসিকভাবে জর্জরিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করা তাকে শিখিয়েছে, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

অভিনেত্রী রাশমির ব্যক্তিগত জীবনেও চ্যালেঞ্জের অভাব ছিল না। দীর্ঘদিন প্রেমের পর ২০১২ সালে তিনি ‘উত্তরণ’ ধারাবাহিকের সহ-অভিনেতা নন্দীশকে বিয়ে করেছিলেন। তবে তিন বছরের মধ্যেই তাদের বিচ্ছেদ হয়। রাশমি ইঙ্গিত করেছেন, এই বিচ্ছেদ তার মানসিক লড়াইয়ের একটি বড় অংশ ছিল। সেই সময়ে তাকে নিজেকে পুনর্গঠন করতে অনেক শক্তি এবং ধৈর্য ব্যয় করতে হয়েছে।

রাশমির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মানসিক সুস্থতা ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হলেও সম্ভব। তিনি জানিয়েছেন, কাজের মাধ্যমে নিজের অস্থিরতা মোকাবিলা করা এবং অভিজ্ঞতা থেকে শেখা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। “কাজই আমার সেফ স্পেস হয়ে উঠেছিল, যা ব্যক্তিগত অস্থিরতার মধ্যেও স্থিরতা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। এখন আমি নিজের মানসিক সুস্থতা ও পেশাগত জীবনের মধ্যে স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছি।”

তবে এই সব বাধা সত্ত্বেও রাশমি দেশাই তার পেশাগত জীবনে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি শুধুমাত্র ধারাবাহিক অভিনেত্রী নয়, বরং রিয়্যালিটি শো-য়ও নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। ‘ফিয়ার ফ্যাক্টর: খতরোঁ কে খিলাড়ি ৬’, ‘নাচ বালিয়ে ৭’ এবং ‘ঝলক দিখলা যা ৭’-এর মতো জনপ্রিয় শোতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের মনে বিশেষ ছাপ রেখেছেন।

রাশমির জীবনের এই যাত্রা প্রমাণ করে যে, অভিনয় ও কর্মের মাধ্যমে মানসিক চাপ এবং ব্যক্তিগত সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। তার অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্যও একটি প্রেরণার উৎস হতে পারে। অনেক সময় আমরা মনে করি যে, বড় মানুষরা সবসময় সুখী এবং শক্তিশালী। কিন্তু রাশমির মতো পরিচিত মুখও দীর্ঘ সময়ের জন্য মানসিক চাপের শিকার হতে পারে। তিনি প্রমাণ করেছেন, সচেতন প্রচেষ্টা, নিজেকে সময় দেওয়া এবং পেশাগত কাজের প্রতি মনোযোগ মানসিক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।

রাশমি দেশাই বর্তমানে নিজের জীবনে শান্তি, স্থিরতা এবং ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নিজের জীবনের উথ্থান-পতন এবং মানসিক যাত্রা শুধুমাত্র নিজের প্রচেষ্টায় সম্ভব। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, বিশেষ করে যারা মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন বা ব্যক্তিগত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছে।

রাশমি দেশাই শুধু একজন সফল অভিনেত্রী নন, বরং একজন প্রেরণাদায়ক ব্যক্তি যিনি নিজের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়কে সামলাতে শিখেছেন। তার জীবন এবং বক্তব্য দেখায়, মানসিক সুস্থতা, পেশাগত জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য অর্জন করা সম্ভব, যদি আমরা ধৈর্য ধরে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করি এবং সঠিক পথ খুঁজে নিই। রাশমির গল্প কেবল তার নয়; এটি আমাদের সকলের জন্য একটি শিক্ষা যে, অন্ধকারের পরেও আলো আসে, এবং পুনরায় শুরু করা সম্ভব।

 

বিথী রানী মণ্ডল/