দীর্ঘ তিন দশক পর ওষুধের নতুন মূল্য তালিকা

দীর্ঘ তিন দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির পর প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকা’ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কিত নতুন গাইডলাইনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে ২৯৫টি অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যা দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তি ও ব্যয় লাঘবে বড় প্রভাব ফেলবে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে ওষুধের তালিকা সংশোধন করা হয়েছিল। সে সময় বাজারে ওষুধের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০টি, যার মধ্যে ১১৭টিকে ‘অত্যাবশ্যক’ হিসেবে চিহ্নিত করে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। গত ৩০ বছরে ওষুধের সংখ্যা বেড়ে প্রায় দেড় হাজারে দাঁড়ালেও তালিকা আর আপডেট করা হয়নি। ফলে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ওষুধ সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যা সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছিল।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান:
২৯৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত: আগের ১১৭টির সাথে নতুন ওষুধ যুক্ত করে মোট ২৯৫টি ওষুধকে অত্যাবশ্যক তালিকায় আনা হয়েছে।
৮০% রোগীর সুবিধা: সরকারের দাবি, এই ওষুধগুলোর ওপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে দেশের ৮০ শতাংশ রোগের চিকিৎসা সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
দাম সমন্বয়: সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কোনো ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। যারা বর্তমানে বেশি দামে বিক্রি করছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে দাম কমিয়ে আনতে হবে।
ওষুধ শিল্পের ওপর যেন হঠাৎ কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, “ইন্ডাস্ট্রির ওপর প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চার বছর সময় দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর ২৫ শতাংশ হারে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নতুন মূল্যের সঙ্গে দাম সমন্বয় করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআই-এর সাথে যৌক্তিক ‘মার্কআপ’ বা লভ্যাংশ ঠিক রেখেই মূল্য নির্ধারণ করা হবে। এই ২৯৫টির বাইরে থাকা বাকি ১১০০ ওষুধও পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশই খরচ হয় ওষুধের পেছনে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে স্টেকহোল্ডার, উৎপাদক, বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেই এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির পর এটিই স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সংস্কার, যা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেবে।
–লামিয়া আক্তার