আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র ও জাতিকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করার যে ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগানো যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার বদলে দেশে এক ধরনের ‘আওয়ামী ফোবিয়া’ বা ভীতি তৈরি হয়েছে, যা নব্য স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের জন্ম দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক পলিসি ডায়ালগে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংলাপে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন,
“আওয়ামী লীগের বিচার হওয়া উচিত ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে, স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তার বদলে আমরা এক ধরনের স্থায়ী ফোবিয়ায় ঢুকে পড়েছি—‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে’, ‘সব দোষ তাদের’। এই ভয় থেকেই দেশে নব্য ফ্যাসিজম তৈরি হচ্ছে।”
গণমাধ্যমের ওপর হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার সময় প্রথম আলো রাষ্ট্রীয় অনুকম্পা পায়নি, কিন্তু সেখানে আগুন দেওয়া হয়নি। অথচ এখন প্রথম আলোতে আগুন দেওয়া হলো। সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্রেকডাউন স্পষ্ট দেখা গেছে। ফোর্স সময়মতো পাঠানো হয়নি। এভাবে দেশ টিকতে পারে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা কেবল সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে অর্গানিকভাবে হবে না, এর জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত ব্যবস্থা দরকার।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “নির্বাচনী ইশতেহার হতে হবে জনগণের সঙ্গে একটি আইনি চুক্তি (জাস্টিসিয়েবল), যাতে সেটি বাস্তবায়ন না হলে নাগরিকরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। শুধু নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই গণতন্ত্র হয় না, নির্বাচিত সরকার কী করে তার ওপর গণতন্ত্রের মান নির্ভর করে।” তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে পালনের ওপর জোর দেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান বলেন, “সংখ্যালঘুরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কী ভাবছে, তা থেকেই কোনো দেশের গণতন্ত্রের মান বোঝা যায়। বর্তমানে সাধারণ মানুষ অধিকারের কথা ভুলে শুধু নিরাপত্তার কথা ভাবছে। প্রোটেকশন দেওয়াটা এখন যেন চ্যারিটি হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আগের মতো যদি আবার বলা হয়—‘আমাদের ভোট দাওনি তাই জুলুম হবে’, তবে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি কী তা আমরা জানি না। অনেকে অন্ধ বিশ্বাস রাখছে নির্বাচনের পর সব সংকট কাটবে, কিন্তু আসলে সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই।” রাজনৈতিক কর্মীদের শুধু ভোট টানা আর বিরিয়ানি খাওয়ানো নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংলাপে বক্তারা একমত হন যে, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পলিসি এবং সময়সীমা (টাইমলাইন) নির্ধারণ করা জরুরি।
-এম. এইচ. মামুন










