পিএসসির পরীক্ষায় মেধাতালিকার শীর্ষে ড্রাইভার আবেদ আলীর প্রার্থীরা

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আলোচিত সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী ও তার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের জাল এবার বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি)। অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে মেধাতালিকার শীর্ষ স্থানগুলো ‘কিনে নেওয়ার’ চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে। ২০২২ সালে সম্পন্ন হওয়া ওই নিয়োগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীসহ অন্তত চারজন প্রার্থী আবেদ আলীর ব্যাংক হিসাবে পরীক্ষার আগে ও পরে মোটা অঙ্কের অর্থ জমা দিয়েছিলেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবেদ আলীর নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ‘দোলন রাইস শপ’-এর ব্যাংক হিসাবে বড় অঙ্কের লেনদেন করেছেন এই চার কর্মকর্তা। পিএসসির ২০১৯ সালের বিজ্ঞপ্তির অধীনে অনুষ্ঠিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধাতালিকায় প্রথম হয়েছেন মো. হাবিবুর রহমান (মেহেরপুর), দ্বিতীয় সানোয়ার হোসাইন (শেরপুর), এবং তৃতীয় হয়েছেন মো. খাইরুল ইসলাম (ঝালকাঠি)। এছাড়া ৩৬তম স্থানে রয়েছেন মো. আনিসুর রহমান (হবিগঞ্জ)।

নথি বলছে, এই চারজনই পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপ চলাকালে আবেদ আলীর হিসাবে টাকা পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্যানুযায়ী, আবেদ আলীর ব্যাংক এশিয়া রিং রোড শাখার অ্যাকাউন্টে জালিয়াতির অর্থ লেনদেন হতো।

মেধাতালিকায় প্রথম হাবিবুর রহমান: লিখিত পরীক্ষার ঠিক এক মাস পর ৮ নভেম্বর ২০২০-এ আবেদ আলীর হিসাবে ২ লাখ টাকা জমা দেন তিনি।

মেধাতালিকায় দ্বিতীয় সানোয়ার হোসাইন: লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাঝামাঝি সময়ে তিনি দুই দফায় ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা জমা দেন। ২০ নভেম্বর ২০২০-এ জমা দেন ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১-এ আরও ২ লাখ টাকা।

মেধাতালিকায় তৃতীয় খাইরুল ইসলাম: তিনি ১ নভেম্বর ২০২০-এ আরটিজিএস-এর মাধ্যমে সরাসরি ৬ লাখ টাকা স্থানান্তর করেন আবেদের অ্যাকাউন্টে।

আনিসুর রহমান (৩৬তম): তিনি তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে ২৯ আগস্ট ২০২০-এ ৫ লাখ টাকা জমা দেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবেদ আলী ‘দোলন রাইস শপ’ নামে যে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করেছেন, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। মিরপুরে যে ঠিকানায় অফিস দেখানো হয়েছে, সেটি মূলত আবেদ আলীর নিজের বাসভবন। বিএফআইইউ আবেদ ও তার পরিবারের ১৬টি হিসাবে ৬০ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পেয়েছে।

এই জালিয়াতির খবর সামনে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আবেদ আলীর সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তারা যে নিয়োগের মাধ্যমে চাকরিতে ঢুকেছেন, সেই প্রক্রিয়াগুলো বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চার কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সৈয়দ আবেদ আলী নিজে জালিয়াতি করে পিএসসিতে চাকরি নিয়েছিলেন এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে চাকরি খুইয়েছিলেন। এখন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই চক্রের শিকড় আরও গভীরে এবং আরও অনেক ‘প্রথম শ্রেণির’ কর্মকর্তা এই জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন।

-এম. এইচ. মামুন