যুক্তরাষ্ট্রকে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল দেবে ভেনেজুয়েলা: যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলায় নাটকীয় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর দেশটির বিশাল তেল সম্পদ নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল দেবে এবং এই বিপুল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওয়াশিংটনের হাতে। তবে ট্রাম্পের এই ‘তেলতত্ত্ব’ এবং ‘তেল চুরির’ অভিযোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

মঙ্গলবার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলা থেকে প্রাপ্ত তেলের অর্থ তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবেন। এই অর্থ ভেনেজুয়েলার জনগণের উন্নয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যয় করা হবে বলে তিনি দাবি করেন। ট্রাম্পের প্রত্যাশা, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন তেল শিল্প পূর্ণোদ্যমে চালু হবে। তিনি মনে করেন, ভেনেজুয়েলা বড় তেল উৎপাদক হয়ে উঠলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা একসময় আমেরিকার তেল ‘চুরি’ করেছিল। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ঐতিহাসিকরা এই দাবিকে ‘অতি-সরলীকরণ’ ও বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে, ভেনেজুয়েলার তেল কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন ছিল না। ১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলা তাদের তেল শিল্প জাতীয়করণ করে এবং ২০০৭ সালে হুগো চাভেজ বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। যদিও কনোকোফিলিপসের মতো কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আদালতে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ জিতেছে, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যেকোনো দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার রাখে। ফলে ‘চুরি’র অভিযোগটি আইনিভাবে টেকসই নয়।

বিশ্বের বৃহত্তম (৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল) তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায় থাকলেও দেশটির বর্তমান অবকাঠামো ধ্বংসপ্রায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন: উৎপাদন আগের অবস্থায় ফেরাতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিধ্বস্ত অবকাঠামো সংস্কার করে পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেল অত্যন্ত ভারী, যা পরিশোধন করা সাধারণ তেলের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল।

ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করলেও কোম্পানিগুলো এখনো ‘ধীরে চলো’ নীতিতে রয়েছে। বর্তমানে কেবল শেভরন সেখানে কাজ করছে। শেভরনের মুখপাত্র বিল টুরেন জানিয়েছেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য কর্মীদের নিরাপত্তা ও সম্পদের সুরক্ষা। অন্যদিকে, কনোকোফিলিপস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে কিন্তু এখনই নতুন বিনিয়োগের কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এক্সন মবিলও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।

মাদুরোর পতনের পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত মাদুরোকে মাদক পাচার ও অস্ত্র মামলায় বিচারের জন্য ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। এই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় বিনিয়োগের আগে কোম্পানিগুলো একটি টেকসই ও স্থিতিশীল সরকারের নিশ্চয়তা চাইছে।

ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দশকের পর দশক ধরে চলা অব্যবস্থাপনা এবং বর্তমান অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল কত দ্রুত বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন রয়েই গেছে।

-এম. এইচ. মামুন