আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-০৪ (খানসামা ও চিরিরবন্দর) আসনের বিএনপি মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী আক্তারুজ্জামান মিয়ার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে গত ১ জানুয়ারি-২০২৬ থেকে একটি প্রতারক চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম এর পোশাক পরিহিত ছবি সংবলিত ভুয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে একাধিকবার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করে।
এ সময় প্রতারকরা নিজেদের পুলিশ সুপার দিনাজপুর পরিচয় দিয়ে জানায় যে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে চিরিরবন্দর থানা এলাকায় দুইটি স্টিল নির্মিত পুলিশ বুথ স্থাপন করা হবে যার একটি ঘুঘুরাতলীতে এবং অন্যটি সুবিধাজনক স্থানে। তারা আরও জানায় যে, উক্ত বুথ নির্মাণের জন্য জেলা পুলিশ একজন ঠিকাদার নিয়োগ করেছে এবং প্রতি বুথ নির্মাণ বাবদ ৮৫,০০০/- টাকা হিসেবে মোট ১,৭০,০০০/- টাকা ও আনুষঙ্গিক খরচসহ সর্বমোট ২,০০,০০০/- টাকা পরিশোধ করতে হবে। এমপি প্রার্থী হিসেবে উক্ত অর্থ “ডোনেশন” হিসেবে প্রদান করে পুলিশকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানানো হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়।
এই প্রেক্ষিতে প্রতারকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ দুইটি বিকাশ নম্বর পাঠায়। পরবর্তীতে দিনাজপুর-৪ আসনের বিএনপি’র এমপি প্রার্থী আক্তারুজ্জামান মিয়া ২ জানুয়ার-২০২৬ খ্রি: বিকাল ১৫.৫৫ ঘটিকায় ঘুঘুরাতলীর একটি বিকাশ এজেন্টের দোকান থেকে উক্ত দুইটি নম্বরে ৫০,০০০/- টাকা করে মোট ১,০০,০০০/- টাকা প্রেরণ করেন।পরবর্তীতে সন্ধ্যার পর আবার একই ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অবশিষ্ট ১,০০,০০০/- টাকা দ্রুত পাঠানোর জন্য তাগিদ দেওয়া হলে এমপি প্রার্থীর সন্দেহ হয়। এরপর পূর্বে দেওয়া বিকাশ নম্বরসমূহে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
উক্ত ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষে ৫নং আব্দুলপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইমরান হোসেন গত ৫ জানুয়ারি – ২০২৬ খ্রি. চিরিরবন্দর থানায় অজ্ঞাতনামা প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন। এজাহারের ভিত্তিতে চিরিরবন্দর থানার মামলা নং-০২/২০২৬, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২১/২২/২৪/২৭ ধারায় মামলা রুজু করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), দিনাজপুর-এর নিকট ন্যস্ত করা হয়।
মামলার রহস্য উদঘাটন করে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি বিশেষ টিম ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার সাথে জড়িত দুইজন প্রতারক আটককৃত হলেন নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার রয়েরবাড়ি চর হোসেনপুর গ্রামের আম্বিয়া আক্তার ও মৃত ইদ্রিস খন্দকারের পুত্র জুনাইদ খন্দকার (২৪) এবং ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানার চরহোসেনপুর গ্রামের হুসনারা ও আরশাদ আলীর পুত্র মোঃ হিমেল (২২) গ্রেফতারের সময় প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৩টি মোবাইল ফোন, ৫টি সিমকার্ড এবং নগদ ১,৪৮,১৩৫/- টাকা উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামীরা জানায়, তারা নিজেদের দিনাজপুর জেলার উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তা তথা এসপি পরিচয় দিয়ে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে। তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের “পুলিশ কন্ট্রোল রুম”-এর নম্বর সংগ্রহ করে এসপি পরিচয়ে কল দিয়ে প্রতারণা করত।
গ্রেফতারকৃত আসামীরা উক্ত প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে ৬ জানুয়ারি -২০২৬ মঙ্গলবার বেলা পৌণে ১২টায় দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) আনোয়ার হোসেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, প্রতারক চক্রটি দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের দুইজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শিল্পপতি দিনাজপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান সরকার ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৪(চিরিরবন্দর খানসামা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুজ্জামান মিয়ার কাছে নিজেদেরকে পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা’র পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করে। তারা নির্বাচনকালীন সময়ে দিনাজপুর-চিরিরবন্দর সড়কে পুলিশ বক্স স্থাপন করা হবে-এমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে বিকাশের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে ক্ষতিগ্রস্ত তারা বিষযটি পুলিশ সুপারকে অবহিত করেন। এরপর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অভিযানে নামে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গাজীপুর ও ময়মনসিংহ থেকে প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
তিনি আরও বলেন, এই চক্রটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে। এরা সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদেরও টার্গেট করে। মোবাইল ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শন, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মিথ্যা আশ্বাসসহ নানা কৌশলে তারা লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন আরো জানান, সম্প্রতি সময়ে এই প্রতারক চক্র দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে প্রতারণা চালানোর পরিকল্পনাও করছিল।