ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যন্ত্র প্রকৌশলে (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) স্নাতক শেষ করে যোগ দিয়েছিলেন চাকরিতে। কিন্তু বাধা ধরা কর্মজীবনে মন টেকেনি নাঈম হুদার (৩২)। নীলফামারী ইপিজেডের চাকরি ও ফ্রিল্যান্সিং ছেড়ে ফিরে আসেন মাটির টানে। আজ তিনি কেবল একজন সফল কৃষকই নন, বরং হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকুণ্ঠপুর গ্রামে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলে প্রতি মাসে আয় করছেন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা।
সাধারণত আমাদের দেশে সবুজ রঙের মাল্টা চাষ হলেও নাঈম দেখিয়েছেন ভিন্ন এক জাদু। বিশেষ ‘রুড প্রুনিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে তার বাগানের মাল্টাকে করেছেন বিদেশের মতো আকর্ষণীয় হলুদ। বর্তমানে তার বাগানে সাত শতাধিক মাল্টা গাছ রয়েছে। নাঈম জানান, “গত বছর মাল্টার রং সবুজ হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাইনি। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শে গাছের বিশেষ পরিচর্যা করায় এবার হলুদ রঙের রসালো মাল্টা ধরেছে।” এবার প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ মণ মাল্টা বিক্রির আশা করছেন তিনি, যার বাজারমূল্য কয়েক লাখ টাকা।
নাঈমের খামারের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। বাজার থেকে চড়া দামে সার ও কীটনাশক কেনার বদলে তিনি নিজেই তৈরি করছেন জৈব সমাধান।
কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট): বর্তমানে তার খামারে ৪৫টি বেড ও অর্ধশতাধিক রিং থেকে মাসে ২৫-৩০ টন কেঁচো সার উৎপাদিত হচ্ছে। ‘নাঈম অর্গানিক অ্যাগ্রো’ নামে এই সার এখন পৌঁছে যাচ্ছে কুমিল্লা, সিলেট, খুলনা ও টাঙ্গাইলসহ দেশের নানা প্রান্তে।
জৈব বালাইনাশক: গোমূত্র, চিটা গুড় ও বেসন দিয়ে তৈরি করছেন সলিড অণুজীব সার। এছাড়া ১০ পদের ভেষজ পাতা দিয়ে তৈরি করছেন প্রাকৃতিক কীটনাশক
নাঈমের ছয় বিঘা জমিতে এখন ফলের রাজত্ব। মাল্টা ও কমলার পাশাপাশি রয়েছে আম, লিচু ও পেঁপে। পুকুরে হচ্ছে মাছ চাষ, আর পুকুর পাড়ে সুপারি ও কাঁঠাল গাছের ফাঁকে মাচাং পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে বিষমুক্ত সবজি। তার এই কর্মযজ্ঞে প্রতিদিন কাজ করছেন অন্তত ১৪ জন শ্রমিক।
একসময় চাকরি ছাড়ায় বাবার বকুনি খেলেও আজ নাঈম তার পরিবারের গর্ব। তার সাফল্যের ঢেউ লেগেছে আশপাশের বেকার যুবকদের মাঝেও। নাঈম এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ জন যুবককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং অনেকে তার কাছ থেকে কেঁচো সংগ্রহ করে নিজস্ব খামার গড়ে তুলেছেন।
চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা বলেন, “নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় নাঈমের এই উদ্যোগ দৃষ্টান্তমূলক। বর্তমানে এটি জেলার সবচেয়ে বড় ভার্মি কম্পোস্ট খামার। তার এই সাফল্য রাসায়নিক সারের ওপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।”
– লামিয়া আক্তার/










