এবারের সংশোধনীতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবহন খাতে। বিপরীতে বরাদ্দ বেড়েছে পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার বিভাগে। রাজস্ব সংকট ও ধীরগতির বাস্তবায়নের মুখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করেছে সরকার। নতুন সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকায়।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন।
আগামী ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধান উপদেষ্টা এটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন।
সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের শিকার হয়েছে স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৭৭ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৭৩ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, স্বাস্থ্যের বড় একটি কর্মসূচি বাতিল করে প্রকল্প আকারে নেওয়ায় এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাতেও বড় আকারের বরাদ্দ কমেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতে ৫৫ শতাংশ এবং প্রাথমিক শিক্ষায় ২৯ শতাংশ বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য কর্মসূচিতেও বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিবহন ও অবকাঠামো খাতে বড় প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দের চিত্র বদলে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে মেট্রো রেল প্রকল্পে। মেট্রো রেল লাইন-১-এ ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ কমিয়ে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা করা হয়েছে (৯১% হ্রাস)। এছাড়া কিশোরগঞ্জ এলিভেটেড সড়ক প্রকল্পে ৯৫ শতাংশ, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়নে ৭৩ শতাংশ এবং শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৭০ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ।
সামগ্রিক কাটছাঁটের মধ্যেও পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে বরাদ্দ ২০ শতাংশ বেড়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এককভাবে বরাদ্দ বেড়েছে ২৮ শতাংশ। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৮ শতাংশ। সংশোধিত এই ২ লাখ কোটি টাকার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ থেকে আসবে ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হবে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে এত বড় কাটছাঁটকে ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “যে সময় স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যয় বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন করা প্রয়োজন ছিল, সেই সময় বরাদ্দ কমানো ঠিক হয়নি।” অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব সংকট ও রিজার্ভের চাপের কারণে এই কাটছাঁট করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি চিকিৎসা অবকাঠামো ও উচ্চশিক্ষার গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদেশি সহায়তা অর্থছাড়ের বিলম্ব এবং অনেক প্রকল্পের ধীরগতির কারণেই মূলত এই বরাদ্দ কমানো হয়েছে।