রোহিঙ্গা সংকটের আট বছর পেরিয়ে গেলেও সমাধান যেন ক্রমশ সুদূরপরাহত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি এখন ‘কথার ফুলঝুরি’তেই সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক স্তরে একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সম্মেলন হলেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও মর্যাদাপূর্ণভাবে রাখাইনে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসা এবং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সম্মেলনের হিড়িক, ফলাফলে শূন্যতা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়। গত বছর আগস্টে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত ‘অংশীজন সংলাপে’ তিনি সরাসরি বলেন, “আমরা কেবল কথার জালে বন্দি থাকতে পারি না, এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।” একই বছর নিউইয়র্ক এবং ডিসেম্বরে কাতারের দোহায় আরও দুটি বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিমের ১১টি দেশ ও জাতিসংঘ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও এর ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা বাংলাদেশের ওপর মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে।
মাদক ও অপরাধের অভয়ারণ্য
রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল মানবিক সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও হেরোইন চোরাচালানের জন্য পাচারকারীরা রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকে ‘সফট স্পট’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ অনেক রোহিঙ্গা যুবককে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রলুব্ধ করছে। বিষয়টি এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছে।
আরাকান আর্মির আগ্রাসন ও নাফ নদীর ‘মৃত্যুফাঁদ’
মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র সংঘাত বাংলাদেশের সীমান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকাগুলোতে এখন যুদ্ধের আবহ। বিশেষ করে নাফ নদীতে বাংলাদেশি জেলেদের ওপর আরাকান আর্মির হামলা ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নাফ নদ এখন জেলেদের কাছে এক ‘মৃত্যুফাঁদ’। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত যদি দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
করিডোর বিতর্ক ও সরকারের অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে খলিলুর রহমানকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হলেও তার একটি প্রস্তাব দেশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। আরাকান আর্মির জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ‘করিডোর’ তৈরির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় খোদ সশস্ত্র বাহিনী ও দেশের সাধারণ জনগণ। প্রবল বিরোধিতার মুখে সরকার সেই উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে এলেও বর্তমানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকর রোডম্যাপ দেখা যাচ্ছে না।
ভবিষ্যৎ কী?
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় ১২ লাখেরও বেশি মানুষের ভরণপোষণ বাংলাদেশের জন্য এক দুঃসহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইনে অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রত্যাবাসনের পথকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমতাবস্থায় কেবল সম্মেলনের টেবিলে আলোচনা নয়, বরং শক্তিশালী কূটনৈতিক চাপ ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে টেকসই সমাধান না বের করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একটি নির্বাচিত সরকার কীভাবে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।










